Tinpahar
No Comments 10 Views

অকালবোধন ( The hidden silence in ‘their’ sound)

সুচরিতা সরকার ( Sucharita Sarkar)
Chemistry Department, Visva-Bharati University

মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ্দুর এসে পড়েছে রাস্তাটার বাঁকে । শান্ত বাতাস , নীলচে ওই আকাশটা বলতে চাইছে – শরত এসেছে ।শরত মানে মানের পর্দায় ভেসে ওঠে একটা পরিচিত ছবি – স্বচ্ছতোয়া নদীর গা ঘেঁষে কাশের বন কানে কানে বলছে কথা , দুলে উঠছে , হেসে উঠছে , ঢলে পড়ছে এর ওর গায়ে , আর নদীর ওই পাশে , সোনার ধানে ধানক্ষেত ভরা , তাদের বুকে খেলা করছে মেঘেদের ছায়া আর নরম রোদ্দুর । কুমোরটুলিতে অসুরের বুকে সবে লেগেছে টাটকা রক্তের এক ঝলক । চারিদিকে পুজোর আগমনী বার্তা একোণ থেকে ওকোণ ছড়িয়ে দিচ্ছে আনন্দধ্বনি । তাই শরত মানেই খুশির রেশ , প্রানের ভিতর আচমকা উথাল পাথাল ।

তবু শরত মানেই ‘ওদের’ কাছে আনন্দের আড়ালে দুঃখের চোরাস্রোত , শরত আসা মানেই ‘ওদের’ কাছে প্রিয়জন ছেড়ে অনেক দুরে যাওয়া , কারণ শরত আসা মানেই যে পুজো আসা !! আর ‘ওরা’ ? কেন ওদের কাছে পুজো মানে বুকের ভিতর লুকিয়ে থাকা একটা বিষাদকে আবার একবার খুঁজে পাওয়া ! পুজো তো সবার বুকেই সাধ জাগায় প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানোর, নতুন পোষাক কেনার । কিন্তু ওরা চাইলেও পরিস্থিতি বিমুখ হে যায়।পুজো ওদের টেনে নিয়ে যায় বাড়ি থেকে বহুদূরে কোনো এক দুর্গামন্দিরের দালানের এক কোণে । ওরা ‘ঢাকি’রা ও ‘ঢুলি’রা । একটা ছোট্ট করুন স্বপ্ন নিয়ে একটু রোজগারের আশায় অনেক দিন আগের পুরনো একটা জামা গায়ে চাপিয়ে তারা বিদায় নেয় এক কুঠুরির ছোট্ট বাড়িটার কাছ থেকে, তাদের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর কাছ থেকে – চোখের জলে ।
পঞ্চমীর বিকালে মন্দিরের আটচালায় এসে ঢোল বাজিয়ে তারা তাদের আগমনের বার্তা শোনায় ।বাড়ির ছেলেমেয়েরা দালানে এসে এক অফুরান অক্লান্ত আনন্দে মেতে ওঠে । ‘ওদের’ কি মনে পরে যায় ওদের বাড়িতে একজন বসে আছে অর পথ চেয়ে, ‘বাবা কবে ফিরবে?’ ষষ্ঠীর বোধন প্রতিমা সাজানো, বহুদিন পর সব আত্মীয়েরামিলে একসাথে পাত পেড়ে খাওয়া , কথায় কথায় হাসির কলরোল , সবকিছু এক নিটল আনন্দময় অনুভতির এক চেনা প্রেক্ষাপট । কিন্তু তারই মাঝে ওদিকের দালানে ওরা চারজন – এক ভিন্ন সুরে কিন্তু একই ছন্দে , কথা বলছে , গল্প করছে । আগমনীর সুরে নিচুগলায় কেউ গান ধরেছে, একজন ঢোল বাজাচ্ছে । ওদের ঢোলের তালে তালে মিশে যায় সেই বিষাদের সুর । হাসি ঠাট্টার অপর পিঠে লেগে থাকে বিদায়ের শেষ অশ্রুর একটা দাগ ।

মহাউত্সবের প্রারম্ভে , সপ্তমীর কাকভোরে সানাইয়ের সুর তাদের মনে করিয়ে দেয় বাড়ির কথা । অপেক্ষায় বিভোর করুন মুখগুলির কথা ।কিন্তু ওরা ঢোল বাজায় , নাচে , হাসিমুখে আনন্দ করে , করতে হয় পরিস্থিতির ভুলে । কিন্তু ওদের পরিবার ওদের ছেড়ে তো পায় না আনন্দ , প্রতি মুহুর্তে তাদের মনে পড়ে , তাদের -ই একজন এখন অনেক দুরে , বহু দুরে – এই দুরত্ব ওদের প্রত্যেককেই ভাবায় ওদের কথা , চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসে ভেসে ওঠা ছোট্ট মুখের একটু হাসিটা ।পুজোর দিনগুলো পার হয়ে যায় । সবার মনে উত্সব শেষের ক্লান্ত বিষাদের ছাপ খুব ধীর লয়ে স্পষ্ট হয় ।ওদের মুখে ফুটে থাকা হাসিটা, ঢোলের তালে নেচে ওঠার ছন্দটা আর একটু চঞ্চল হয় ।অদম্য এক আবেগ যা হৃদয়ে তোলপাড় তুলতে চায় , তার ঘুম ভাঙে ।

দশমীর সকালে সানাই বলে আমি বিষাদময়ী, আমি বিদায়ী। ঢোলের মৃদু বোল সারাবছরের অপেক্ষার পরিপূর্ণতার সম্পৃক্ত আনন্দকে নাড়িয়ে দেয় আরো একবার । সাদা পোষাক , সিঁদুরের খেলা, বেলপাতার একন থেকে অকন ছড়িয়ে থাকা, নুয়ে আসা কলাপাতাতার ঘটের একপাশে হেলিয়ে পড়া , সব-ই বলে এবার আসি । একদিকে বাড়ি ফেরার আশা ওদের আর একটু আনন্দ দিয়ে যায় , অন্যদিকে ওদের পরিবারে পথ চেয়ে বসে থাকার দিন শেষ হয়ে আসতে থাকে ।ওরা নাচে, ঢোলের সাথে।শেষ সময়ে আভোগের পরশ সবকিছুকে এক চরমতম পর্যায়ে নিয়ে যায় দশমীর রাত্রির প্রতিমা নিরঞ্জন । প্রতিমা ঝুপ করে জলে পরার সাথে সাথেই কারুর চোখের কোণের টলমল করতে থাকা জলটা টুপ টুপ করে ঝরে যায় ।দুর্বল এক আবেগ বলে ওঠে আবার এস মা, আসছে বছর আবার হবে । পুকুরঘাট থেকে মন্দিরে ফেরার সময় ওদের ঢোলে বেজে ওঠে আনন্দের বোল ।সবার মাঝে ছড়িয়ে যায় ব্যস্ত এক মহা উত্সব শেষের ক্লান্ত বিষাদের ছায়া । সবাই বাড়ি ফেরে নিঃশব্দে কিছু টাটকা স্মৃতি বুকের পাশে নিয়ে । আর মন্দিরে ফেরে আনন্দ করতে করতে ।কারণ পরের দিন যে তারা দেখতে পাবে তাদের প্রিয়জনদের মুখ গুলো ।

পরের দিন সকালে ওরা গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ঢোল বাজায় , আর সাথে ওদের ঝুলি ভরে ওঠে থলিভরা নাড়ু ,
মুড়ি, মুরকি , মিষ্টি , চাল , দল, সবজি , ফল , আরো নানান রকম খাবারে । আবার পুরনো পোষাক , টাকা পয়সাও ভরিয়ে দেয় ওদের নিয়ে আসা খালি থলিগুলি । এমনি করে ঝুলি ভরে ওঠে নানান জিনিসে , মন ভরে ওঠে চেনা মুখ গুলোকে আবার কাছে পাওয়ার আনন্দে । দক্ষিণার টাকায় ও মন্দির থেকে পাওয়া টাকায় বাড়ির সবার জন্য স্বল্প কিছু তারা কিনে নিয়ে যায় তাদের প্রিয়জনদের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুযায়ী ।

শেষ পর্যন্ত বিকেলের পরে আসা রোদ্দুরে ভাঙা রাস্তাটার বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা দেখে দুরে মাঠের আলে পিঠে ঢোল আর কাঁধে ঝোলা নিয়ে জ আসছে সে অর বাবা না!! এক ছুট্টে চলে আসা বাবার কাছে , ভাইবোনেরা দাদার ডাকে ছুটে আসে , পড়ন্ত বেলায় দিগন্তের অপার থেকে সুর্যটা একবার উঁকি দিয়ে দেখে – বাবা আনন্দে ঢোল বাজাচ্ছে , ছেলেমেয়েরা বাবা এসেছে বাবা এসেছে বলে নাচতে থাকে । ঢাকির বউ দাওয়ায় বসে ঘোমটার নিচে মুচকি হাসিতে লুকাতে চায় এক বিন্দু চোখের জল ।সবকিছু মিলে যায় এক আনন্দের ব্যঞ্জনাময় ঝঙ্কারে । যেন প্রাণ পায় ওদের এককুঠুরির ছোট্ট ভিটেটা ।ঢাকি তার বোঝাই হায়া থলি থেকে বের করে অর ছেলেমেয়েদের ঔত্সুক্যময় ধনগুলি – নতুন পুরনো পোষাক , নানান রকম খাবার , খেলার সামগ্রী ।বাচ্চারা আনন্দে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে এক ভরপুর আনন্দে । বাবার আনা নতুন জামাকাপড় পরে উঠোনে আনন্দ করে সবে মিলে । ওদের বাড়িতে বাড়িতে ওঠে খুশির রোল , আনন্দের কলরব – এতদিন ধরে ওই মানুষটার অপেক্ষায় থাকার কষ্টটা ম্লান হয়ে যায় ।

রাতে লন্ঠনের টিমটিমে আলোর চারিদিকে বসে বাড়ির সকলে ঢাকির কাছে তার এই দুরে থাকার কথা শোনে , আবছা অন্ধকারে তাদের কৌতুহলে আবিষ্ট মুখগুলো একদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে গল্প শোনে – বিশাল মন্দির , লোকের ভিড় , ঝাড় লন্ঠন , এলাহী খাওয়া দাওয়া , বড় বড় গাড়ি বাড়ি। ওরা অনেক দিন পর আবার একসাথে পাত পেড়ে খায় ।ওরা পুজোয় একসাথে আনন্দ করতে না পেলেও এই অন্য রকম আনন্দের মধ্যে আছে এক বিরল অনুভুতি ।পুজোর আগে যে আনন্দগুলো সবার বাড়িতে ঘটে – ষষ্ঠীর বোধনে । সেই বোধনের সুর পুজোর পর আবার বেজে ওঠে ঢাকিদের ঘরে ঘরে । এও তো এক বোধন – অকালবোধন ।

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top