Tinpahar
No Comments 12 Views

আমরা যখন পর্যটক 2/2

গাইড – এটা চৈতী ভবন , আর এটা পাখিরালয় , আর এটা জেনারেল কিচেন এখানে খাওয়াদাওয়া হয় । এটা একটা গার্লস হোস্টেল এটার নাম শ্রীসদন , ওই যে খড়ের বাড়ি দেখতে পাচ্ছ ওটার নাম বেনীকুঞ্জ , ওই দিকে একটা বাড়ি আছে নাম দিনান্তিকা আগে নাম ছিল চাচক্র ছিল , এই মাঠটা হ্যালিপ্যাড গ্রাউন্ড ছিল ……. ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখানে নামত । তোমরা খাওয়া দাওয়া করেছ ?
অর্কজিৎ – ও বাড়ি গিয়ে করে নেব …..
গৌরব – মানে আমরা হোটেলে নয় , মানে বাড়িতে উঠেছিতো …..
গাইড – না …… ২ টোর পর খাওয়া পাওয়া যাবেনা তাই । এই এখানে একটা ফাংসান হোতো , কিণ্তু হলনা , কয়েকটা স্কাউনড্রেল মিসাক্রি সৃষ্টি করে , সবাই কি ছাত্র …… কি তোমরাই বল সবাই কি ছাত্র ? একদল ছেলে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিলো , দোল এত বড় একটা ব্যাপার , কি কলাভবন ……. {মোরালিটির দায় এডিট করা হ’ল ……..}
………এটা কুম্ভকার , ওটা বিড়লা গার্লস হোস্টেল , এই হোস্টেল গুলো কম্পানিদের দান , ওখানে একটা ডান্সারের মূর্তি আছে দেখ , পিছনে আমাদের কলা আর সঙ্গীত ভবন , কলাভবনে কিছু মূর্তি সেগুলো রামকিঙ্কর বেজের তৈরী , নন্দলাল বসুর তৈরী । কালোবাড়ি , ওখানে সঙ্গীত ভবন আছে ……. ওকি করছ ! চোখে দেখতে হবে ……
গৌরব – আমি তো চোখে করেই …….
গাইড – না না এটা উপলব্ধির জায়গা , এখানে দেখার কিছু নেই ।কিছু গাছ কয়েকটা মডেল , কয়েকটা বাড়ি , এই ছাড়া এখানে কিছু নেই , এখানে অনুভব করতে হবে । সাধারণ মানুষ কিছু বোঝেনা , কেউ এক টাকা করে পার হ্যাড দেয় , আমরা বুঝিয়ে বুঝিয়ে নিয়ে আসি , কিণ্তু যারা শিক্ষিত , স্কুলে কলেজে পড়ে , তাদের এখানে ভাবতে হয় ওই মূর্তিটা কি , কেন , কেইবা তৈরী করল এখানে ……..ওই মোষটা একটা সিম্বলিক আর্ট , হট টেম্পার্ড ছেলে পদ্মপুকুর নষ্ট করেছিল ওটাই ওখানে দেখানো আছে । আর মূর্তি ওখানে রাখার কারণ ওখানে মেয়েদের হোস্টেল আছে , চোখটা ওইখানেই যাবে । আসলে শান্তিনিকেতনটা বিশ্ববিদ্যালয় নয় , কবির সেই আদর্শের সঙ্গে এর কোনো মিল আজ আর নেই ।দেখ ওই মূর্তি জলে গলে যাচ্ছে , সুজাতা জলে ভেঙে যাচ্ছে ।নোবেল চুরি হওয়ার একটাই কারণ কোনো আন্তরিকতা নেই ।ছাত্র রাজনীতি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শেষ করে দিয়েছে , নইলে এত টাকা আসে , কেউ একবার বললনা শান্তিনিকেতনকে সুন্দর করা হোক । আমাকে এখানে V.C. করলে সবাইকে মেরে ঠান্ডা করে দিতাম রাস্তা ঘাট চকচকে করে একেবারে ক্লিয়ার করে দিতাম ……… এই এক বিখ্যাত মূর্তি , সাঁওতাল পরিবার , রামকিঙ্কর বেজের বিখ্যাত মূর্তি । রামকিঙ্কর এই দুটি বানান একটা ৫৫ সালে একটা ৩৮ সালে …….. { উত্তেজিত হ’য়ে }……… না তোমরাই বল এখানে সব ব্যাটারা আশি হাজার করে মাইনে পায় , কেউ কি বলল জায়গাটাকে সুন্দর করা হোক , এত ছাত্র পড়ে , হা গো ! কেউ বললনা …… { হ্তাশ } ।
আমরা – এর পর কোথায় যাব ?
গাইড – যাও মিউজিয়ামে চলে যাও , নিইলে দেখ কাছাকাছি ডিয়ার পার্ক আছে , ওই ওখানে রিক্সা পাবে , হ্যা আমারটা দিয়ে দাও , ৫০
অর্কজিৎ – এইযে ।
পরাশর – গৌরব , দেখ তো একটা রিক্সা-টিক্সা কিছু , সময় নেই বুঝলি , ঘরও ফিরতে হবে ……
শৈলেন – এই , এখানে ৮০০ বলছে চাপব ?
আর্কজিৎ – মাত্র ৮০০ ! শৈলেন , তুমি একাই যাও আমরা বরং …
গৌরব – শোন শোন , ২০০ ক’রে দুটো বলল ……
পরাশর – আর একটু বারগেন করনা …..
জনৈক – দেখো ১৫০ বলছি আর কমবেনা কিণ্তু
পরাশর – দুটোতে ৩০০ তো
শৈলেন – কি কি ঘুরব
রিক্সাওয়ালা ১ – আশ্রম ছাড়া সব দেখিয়ে দেব বুঝলে , কলাভবন , শ্রীনিকেতন , শিক্ষাসত্র , প্রাকৃত ভবন , তিনপাহাড় , ক্যানেল , ক্যানেলের পাড় সবই …… খোয়াই দেখলে বেশি লাগবে ।
পরাশর – নানা ….. ওই-ই দেখব ।
রিক্সাওয়ালা ২ – কোন দিকে যাব ?
(চাপার পর পরাশরদের রিক্সায় )
রিক্সাওয়ালা ১ – শ্মশান ……..!! ওখানে সৃজনী বলে একটা জায়গা আছে ওটা দেখবে ….
পরাশর – আপনার নামটা কি ?
রিক্সাওয়ালা ১ – পুনব
পরাশর – ওনার নাম
রিক্সাওয়ালা ১ – হা তুর নাম টো কি …… { চেচিয়ে } ? ওর নাম সমীর ……. মাল কিছু কেনার থাকলে বলবেন বেশ ।
পরাশর – আমরা কিনে নিয়েছি।
শৈলেন – ওই দুটো বিল্ডিং ? {মাধবী ও করবী কে দেখিয়ে}
রিক্সাওয়ালা ১ – ওটা VIP গেস্টহাউস !!
পরাশর – {কানে কানে} ওটা গার্লস হোস্টেল …
রিক্সাওয়ালা ১ – গাইড করে দেখলেন তো?
পরাশর – হ্যা।
রিক্সাওয়ালা ১ – ওরা আবার কিছু দেখায় নাকি ! এখান থেকে ওখানে হাটিয়ে দেবে ব্যাস, রিক্সায় করে গেলে সব জায়গা দেখা টেখা হয়, ওরা সব জায়গায় যায়-ও না। আমরা সব ঘোরাই। ওরা, কিরকম একটা, ছিড়িং বিড়িং করে দেখিয়ে দেয়। আমরা সবসময় বুঝিয়ে বলি।
পরাশর – খোয়াই-এ কি আছে ?
রিক্সাওয়ালা ১ – ওখানে একটা নদী আছে। আর সিনেমার নায়ক নায়িকারা ওখানে সুটিং করে , ওদের দেখা যায়। খোয়াই একটা দেখার মত জায়গা। মানে, ওখানে একটা হাত বসে ….ওখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিল, কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি / বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি …হাত বসেছে শুক্রবারে ….ওটা এখন আর শুক্রবারে বসেনা, ওটা শনিবারে বসে।
{ পরের লাইনটা ছিল বক্সিগঞ্জের পদ্মাপাড়ে, খোয়াই-এ পদ্মাপাড় নেই সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত }
শৈলেন – ডেট চেঞ্জ হয়ে গেছে { কিছুক্ষণ পর }।
পরাশর – সমস্ত ঘুরতে কতক্ষণ লাগবে ?
রিক্সাওয়ালা ১ – দু’ঘন্টা লাগবে।
পরাশর – একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে বুঝলেন …
রিক্সাওয়ালা ১ – আপনারা তাড়াতাড়ি করলেই তাড়াতাড়ি হবে, এই অমর্ত্য সেনের বাড়ি, এখানে অমর্ত্য সেন থাকে, এটা খুব ভালো দেখার জায়গা। নেমে দেখবেন ?
পরাশর – নানা, এখন না …আপনি চলুন।
রিক্সাওয়ালা ১ – কিছু কিনলে টিনলে বলবেন, আমাদের চেনা দোকান আছে, নইলে ঠকিয়ে টকিয়ে দেয় তো এই আরকি …..
শৈলেন – { এন্ড্রুজ-পল্লী কয়াতের দেখিয়ে } এগুলো কী ?
রিক্সাওয়ালা ১ – এগুলো বাড়ি। এখানে ছাত্ররা থাকে। বাইরের ছাত্ররা এখানে ভাড়া থাকে। আপনারাও থাকতে পারেন। যে কেউ ভাড়া দিলেই থাকতে পারে।
পরাশর – কেন, ওরা হোস্টেলে থাকেনা ?
রিক্সাওয়ালা ১ – থাকে, তবে এখানে বেশী আরাম তো । যদি কোনদিন লাগে তো আমাদের বলবেন , আমরা দেখেটেখে দেব ।
পরাশর – বেশ বেশ !
শৈলেন – মাঠটা কাদের ? { বিনয় ভবন }
রিক্সাওয়ালা ১ – এটা আসলে … ঐ যে মেলার মাঠ আছে না , ওই ওখানে যে সব বাসগুলো এখানে রাখে । টুরিস্টগুলো সব এখানেই থাকে ।
শৈলেন – ওটা কি হোস্টেল ? { New Physical Education department }
রিক্সাওয়ালা ১ – নানা হোস্টেল হবে কেন ওটাতো হোটেল । আপনারা খেয়েছেন ?
পরাশর – আপনি কোথায় থাকেন ?
রিক্সাওয়ালা ১ – আমি লোকাল , কুরুম্বায় থাকি ।
{ ইতিমধ্যেই আমাদেরই দুই বন্ধু হরিশ ও দেবজ্যোতি উল্টোদিক থেকে এসে আমাদের ডাকলো }
পরাশর – এখানে কি কাটতে হয় ? { সৃজনী }
রিক্সাওয়ালা ১ – নানা এমনি, যান ।

সৃজনীতে তেমন কিছু হয় নি , ঢোকার পথে সিকিউরিটি গার্ড আমাদের মধ্যে দুজনের নামসহ ঠিকানা লিখতে বলে । শৈলেন স্বভাবতই একটা সই করে । গৌরব কেবল নকল নাম লেখার সময় ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ -এ কটা য-ফলা বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে ছিল । যাইহোক সিকিউরিটি গার্ডের চোখে পড়েনি । এরপর বেরিয়ে এসে ……
রিক্সাওয়ালা ১ – এই যে এই দিকে দেখুন , এটা হচ্ছে শ্মশান , এখানে ম’রে ট’রে গেলে পোড়ানো হয় ।
শৈলেন – অমা তাই !
গৌরব – { ফিসফিস করে } ওভার এক্টিং করিস না ।
অর্কজিৎ – গৌরব এদিকে ওটা ওদের , এই রিক্সাটা আমাদের ।
পরাশর – নানা এবার ওটায় যাই ।
অর্কজিৎ – ওটাতেই যা, { ফিসফিস করে } আমাদেরটা বোবার মত কিছুই বলছেনা ।

রিক্সাওয়ালা ১ – তোমাদের ওই গাইডটো সব দেখিয়েছে তো ।ওই কবি রবিঠাকুর লিখেছিলেন না , তালগাছ দাঁড়িয়ে ওটা একটা বাড়িতে বসে দেখবে তিনপাহাড়ের পাশে , কাঁচমন্দিরের পাশে ।
পরাশর – দেখেছি ।
রিক্সাওয়ালা ১ – ওই দুটো পুকুর আছে ওটা কালিসায়ারের পুকুর । মন্দির দেখবে ?
পরাশর – আজ আর নয় , অন্য কোনদিন হবে ।
রিক্সাওয়ালা ১ – দেখ এটা একটা টাওয়ার , ফোনের টাওয়ার , এদিক ওদিক দেখুন গাছ টাছ আছে ভালো লাগবে ।
এই যে এটা হলো খেলার মাঠ । আর এটা মিউসিয়াম, { শিল্পসদনকে দেখিয়ে }
শৈলেন – অফিস অফিস মনে হচ্ছে তো !
পরাশর – { ফিসফিস করে } অফিসকে অফিসের মত মনে হবে না , তো কি মিউস্য্য়ামের মত মনে হবে ?
রিক্সাওয়ালা ১ – যাও যাও ঘুরে এসো খুব ভালো লাগবে । { গৌরবের দিকে তাকিয়ে } যাও ঘোরো ……..
গৌরব – { অর্কজিৎ-র দিকে তাকিয়ে } লে মর্গা , কি ঘুরব ?
পরাশর – বেশ বেশ তরা বেশী কথা বলিস না , গৌরব জল ভরে আন ।
অর্কজিৎ – আমি শৈলেনকে নিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে আসি ………..

শৈলেন – আচ্ছা পল্লী শিক্ষাভবন লেখা এটা কি ?
রিক্সাওয়ালা ১ – চাষ হয় এখানে । দেখছ না গাছ এত । ওদিকটা চিপকুটি
শৈলেন – কি কুটি ?
পরাশর – চিপ্কুটি রে চিপকুটি ।
রিক্সাওয়ালা ১ – এখানে আদিবাসীরা থাকে ।
পরাশর – আচ্ছা আপনাদের কত হয় , মানে দিনে ?
রিক্সাওয়ালা ১ – হয় সিগনে , মানে মেলা টেলা হলে হাজার ছাড়িয়ে যায় । আর সাদা বাবুরা এলে এক টিপেই পাঁচস থেকে হাজার । ওরা খুব ভালো।
পরাশর – ও , আচ্ছা পাঁচশো তাকে তোমরা কথা থেকে কোথায় নিয়ে আস ?
রিক্সাওয়ালা ১ – ওরকম তো কিছু নেই , মানে বুঝলে তো ওইও যে হোটেলে যে থাকে । এই ধর ছুটি লজ থেকে মেলার মাঠ এই আর কি । তোমরা তো এখানে থাক না , তাই বুঝতে পারবে না , এই আরেকটা স্কুল , শিক্ষাসত্র , এটা ওই স্কুলটার চেয়ে ছোট ।
পরাশর – তাই নাকি ?
রিক্সাওয়ালা ১ – এই যে এই এবার বন শুরু হয়ে গেল । এটার নাম তোমরা কি যেন?
শৈলেন – না , কেন ?
রিক্সাওয়ালা ১ – এই বনটার নাম ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙ্গা মাটির পর’ …. এই মানে ‘পথ’ । কবির অনেক বই আছে , ওখানের একটাতে লেখা আছে ।
পরাশর – আচ্ছা , একটু তাড়াতাড়ি কাকু , আমাদের ঘর ফিরতে হবে ।
রিক্সাওয়ালা ১ – বেশ আমি তাড়াতাড়ি টেনে দিচ্ছি ।

পরাশরদের রিক্সায় এরপর আর বিশেষ কিছু ঘটে নি । আমি আর গৌরব আমাদের রিক্সাওয়ালাকে খুব চেষ্টা করেও কিছু বলাতে পারিনি , তাকে যাই জিজ্ঞাসা করা হোক না কেন সে কেবল বলে ‘ওটা তেমন কিছুই নয়’ ।

এর আগে আমরা এক অন্য শান্তিনিকেতনকে চিনতাম , আজ আমাদের এক সম্পূর্ণ অন্য ধারণা হলো । বাইরের লোকেদের কাছে বিশ্বভারতীর এ রূপটাই প্রকাশ পেয়ে থাকে । লেখাটা কারোর কাছে হাসির খোরাক হতে পারে , আবার তথাকথিত এলিট সম্প্রদায় এ নিয়ে রাগ-ও করতে পারেন । আমাদের কাছে ব্যাপারটা শুধুই বিস্ময়কর । রবিঠাকুরের আপন দেশের কর্তারা যদি এদিকে একটু মন দেন , তাহলেই আমাদের প্রয়াস ধন্য হবে ।

[ কথোপকথনের সবটা বাস্তব ]

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top