Tinpahar
No Comments 42 Views

কালো কোট

আমার বাবার একটা কালো কোট ছিল, বোধহয় বিয়েতে পাওয়া। বাবা সেটা খুব একটা পরত না – আলমারিতে তোলাই থাকত। আমার জন্মের আগের ছবিতে ছাড়া বাবাকে আমি কখনোই কালো কোট পরা অবস্থায় দেখিনি।  কালো কোট পরা লোক আমি প্রথম দেখি ট্রেনে। পুরুলিয়া থেকে হাওড়া যাওয়ার তখন একটাই গাড়ি। হাওড়া চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার। পুরুলিয়া থেকে সন্ধেবেলা ছাড়ত, হাওড়ায় ঢুকত পরদিন সকালে।  দুটো স্লিপার নেওয়া হত। চারজনের টিকিট –কিন্তু স্লিপার দুটো। চারটে স্লিপার নেওয়ার মতো পয়সা আমাদের ছিল না । সেই স্লিপার দুটোর একটাতে বাবা ,  অন্যটাতে মা আমি আর দাদা। আমি তখন নিতান্ত কুঁচো, দাদা বড়ো তবে খুব বড়ো নয় । ফাইভ-টাইভে পড়ে । মা সেই স্লিপারে দাদাকে আর আমাকে শুইয়ে মাথার কাছে বসে থাকত । ট্রেনের সিট কাঠের , ফাঁক ফাঁক। একটা খুব কম পাওয়ারের হলদে আলো জ্বলত। অনেক সময় ট্রেনের মেঝেতে জল থাকত। সেই জল কোথাকার কে জানে ! মা বলত বাথরুমের, হবে। চটিতে  জল লাগাতে নিষেধ করত। ট্রেন চলত কয়লার ইঞ্জিনে। আদ্রাতে এসে ইঞ্জিন বদল হত , কয়লার ইঞ্জিনের বদলে ডিজেল ইঞ্জিন লাগত।
এই ট্রেনে কালো কোট পরা চেকারই আমার জীবনে প্রথম কালো কোট পরা লোক। চেকারকে আমি খুব ভয় পেতাম। আমার মনে হত টিকিট চাইবে আর বাবা টিকিট দিতে পারবে না। বাবা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলত। যখন যেটা পাওয়ার কথা সেটা খুঁজে পেত না । ভুল ট্রেনে উঠে পড়ত। একবার কলকাতা থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার ট্রেনের বদলে আমরা হাওড়া-গোমোতে উঠে পড়েছিলাম । তার আগে থেকেই এবং বিশেষ করে তার পর থেকেই মা বাবাকে একেবারেই ভরসা করতে পারত না।  আমি ভাবতাম কালো কোট টিকিট চাইবে , বাবা পাবে না। তখন  আমাদের চারজনকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেবে । আমরাও কোন একটা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চুপ করে বসে থাকব সারারাত। প্ল্যাটফর্ম বলতে তো মাটির নাবাল উঠোন । ছররা, বাগালিয়া, কুস্তাউর – পুরুলিয়া থেকে আদ্রা যাওয়ার পথের এই স্টেশনগুলোতে প্ল্যাটফর্ম বলতে  কিছুই ছিল না, মাটির নাবাল জমিতে লাফ দিয়ে নামতে হত।
কালো কোট আদ্রার আগেই টিকিট দেখে যেত । কিন্তু আমার  অনেক কিছু হারিয়ে ফেলা বাবা একবারও কালোকোটের কাছে হেরে যায়নি । কাউন্টারে লেদ মেশিনের ঘটাং শব্দে হলদেটে ব্রাউন পিসবোর্ডের মতো মোটা যে টিকিট দিত, যা নিয়ে আমি পরে খেলতাম তা এপকেট ওপকেট খুঁজে ঠিক কালো কোটকে বাবা দিয়ে দিত । ফলে সারারাত প্ল্যাটফর্মে বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে আমাদের কোনোদিন বসে থাকতে হয়নি । কলকাতায় আমরা মাসির বাড়ি যেতাম । আমাদের সুটকেশ একটা , মা একটা কী কায়দায় কাপড়ের বোঁচকা বাঁধত । অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন কৌটো   নিত । তাতে থাকত লুচি , আলুর দম । কালো কোট চলে গেলেই টিমটিমে আলোয় আমরা লুচি, আলুর দম খেয়ে নিতাম । বাবা একটা স্লিপারে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ত । আমি আর দাদাও । মা মাথার কাছে বসে বসে ঢুলত । অনেক রাতে আমার  ঘুম ট্রেনের আওয়াজে ভেঙে গেলে দেখতাম মা আমার পিঠে মাথা রেখে গুঁজরে-মুজরে  ঘুমোচ্ছে । টিমটিমে হলদে আলোর বদলে আরও কম একটা নীল আলো জ্বলছে। ভিজে মেঝে দিয়ে বড়ো বড়ো আরশোলা যাচ্ছে । তাদের পিঠ ঠিক বাদামি নয় – ট্রেনের আরশোলাদের চেহারা অনেক বড়ো । পিঠ যেন কালচে । আরশোলা কালো কোট পরে না তা অবশ্য জানতাম । সত্যি কি পরে না !
দ্বিতীয় যে কালো কোট আমার জীবনে আসেন তিনি মাস্টারমশাই । আমাদের বোর্ডিং স্কুলে কালো কোট পরা মাস্টারমশাই একজনই । ক্লাস ফোর-ফাইভে তাঁর সগর্জন অস্তিত্ব । সেখানেই শেষ । ফোরে তিনি এ সেকশনে ইতিহাস পড়াতেন বি সেকশনে বাংলা । ফাইভে ওয়ার্ডেন, আমাদের শাসন করতেন । সিক্স থেকে ছাত্রদের জীবনে তাঁর কোনও অস্তিত্ব ছিল না । আমাদের স্কুলের অথরিটি সিক্স থেকে তাঁকে দুধভাত করে দিয়েছিল । খেলতে মানা । তবে ফোর-ফাইভে তিনি ছিলেন যথেষ্ট ত্রাস ।  ইতিহাস বই থেকে রিডিং পড়তেন, বাংলা বই থেকেও । আমাদের এক দুজন বন্ধুর কাছে ছাত্রবন্ধু ছিল । ছাত্রবন্ধু সব বিষয়ের সরকারি  নোটবই । বইয়ের  এক শরীরে যাবতীয় বিষয়ের প্রশ্নোত্তর । মাস্টার কালো কোট  সেই ছাত্রবন্ধু বাজেয়াপ্ত করেছিলেন । তিনি সেখান থেকে প্রশ্নোত্তর করাতেন । জমা নিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় অমর চিত্রকথা , ম্যানড্রেক, অরণ্যদেব । তিনি আমাদের বোর্ডিং-এর ওয়ার্ডেনও ছিলেন যে । যদিও আমাদের বোর্ডিং স্কুল রেলস্টেশন নয় তবু সেখানে স্টেশনের মতোই সব কিছু ঘন্টার শব্দে চলত । ঘন্টা বাজলে ট্রেন ছোটে বোর্ডিং স্কুলে আমরাও ঘন্টার সঙ্গে ছুটতাম । রাতে থার্ডবেল বাজলে সেই ছোটা থামত । আমরা একানে চৌকিতে মশারির তলায় ঢুকে পড়তাম । আলো নিভে যেত । তখন শুধু ওয়ার্ডেনের ঘর, বারান্দা , বাথরুমে আলো জ্বলতে পারে । কালো কোটের ঘরে আলো জ্বলত । আমাদের ঘুম আসত না । অরণ্যদেব নেই, ম্যানড্রেক নেই, অমর চিত্র কথা নেই । সব ওখানে ওই টিকিট চেকারের মতো ওয়ার্ডেনের ঘরে । অনেক রাতে অভিষেক উঠে পড়ে । পা টিপে টিপে কালো কোটের ঘরের সামনে যায় । বসন্ত কাল । ফুরফুরে রাত হাওয়া । ওয়ার্ডেনের ঘরে বারান্দার দিকের জানলা আলতো করে খোলা । অভিষেক খোলা জানলায় চোখ দিয়ে দেখে দড়িতে কালো কোট ঝুলছে, কালো কোটের মালিক চেয়ারে  । সামনে খোলা অরণ্যদেব ।
চলমান অশরীরী এই ছিল ইংরেজি ফ্যান্টমের বাংলা পরিচিতি । খুলি গুহায় থাকে । ঘোড়ায় চাপে । অন্যায়ের যম । পিস্তল আছে । বিদ্যুতের মতো দ্রুত তার চলা ফেরা। তবে তাকে দেখতে পায় না সবাই । আমার বিশ্বাস চলমান অশরীরী অরণ্যদেব কালোকোট ওয়ার্ডেনকে পছন্দ করতেন না । তার প্রমাণ অবশ্য কোনোদিন পাইনি । পছন্দ না করলে অরণ্যদেবের উচিত ছিল বই থেকে বাইরে এসে আমাদের ওয়ার্ডেনের চোয়ালে ঘুষি মেরে খুলি চিহ্ন এঁকে  দেওয়া । ইদানীং কালোকোট প্রায় চোখে পড়ে না । উধাও – শুট, জ্যাকেট আছে কিন্তু কোট   কোথায় ! তাহলে কি সত্যি অরণ্যদেব কালো কোট ব্যাপারটার ওপরেই রেগে গিয়ে এতদিন পরে জিনিসটাকেই উধাও করে দিল বাঙালির শরীর থেকে । উত্তর মেলে না ।  বাবার কালো কোট পরা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবিটা আছে , তবে বাবা নেই । অরণ্যদেব হতে না পারলেও বাবা চলমান অশরীরী হয়ে গেছে ।
About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RELATED ARTICLES

Back to Top