Tinpahar
No Comments 14 Views

গরুর উৎপাত !!!

“রাস্তা সবার জন্যে ” বিশ্বভারতী  কর্তিপক্ষের সম্প্রতি জারি করা এক বিগপ্প্তিতে  এই কথাটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

শান্তিনিকেতন এর অন্যতম  ব্যস্ততম তথা প্রধান রাস্তা শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড। এই রাস্তা শান্তিনিকেতন এর কাচ মন্দির এর সামনে থেকে শুরু হয়ে শ্রীনিকেতন পর্যন্ত বিস্তৃত।কাজেই এই রাস্তার গুরুত্ব শান্তিনিকেতন নিবাসীদের কাছে অপরিসীম।কিন্তু দীর্ঘ দিন যাবৎ সন্ধ্যা  হতেই এই রাস্তায় চলাফের করা দুস্কর হয়ে ওঠে।না চোর-ডাকাত কিংবা ছিনতাইবাজ এর ভয়ে নয় (ওই সব তো আছেই-থাকেই) অতি নিরীহ প্রাণী গরুর উৎপাতে।
শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড এর বেশির ভাগ অংশই অন্ধকার। মূলত কলাভবনের পর থেকে আর আলোর দেখা মেলে না। আর এই অন্ধকার সর্বাধিক গহন হয় নোবেলজয়ী  বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর বাড়ি বা সায়েন্স এর মোড় থেকে।যা প্রায় শ্রীনিকেতন পর্যন্ত চলে। আর মূলত এই অন্ধকার জায়গাতেই শুরু হয় গরুর উৎপাত। অবশ্য একে উৎপাত বলা চলে কিনা তা নিয়ে দ্বিমত আছে।
 ঘটনা হলো এই যে অন্ধকার এর সুযোগ নিয়ে সায়েন্স  এর মোড় থেকে প্রায় শ্রীনিকেতন পর্যন্ত রাস্তা  সন্ধ্যার পর থেকেই চলে যায় গরু বাহিনীর দখলে। শুয়ে , বসে ,দাড়িয়ে  ইত্যাদি নানা ভঙ্গিতে -নানা বয়সের  পুরুষ -মহিলা-শিশু নির্বিশেষে বহুল সংখ্যায় গরুর দেখা মেলে এই রাস্তার উপরে।যা সাভাবিক ভাবেই পথচারীদের পক্ষে সমস্যার কারণ হয়ে দাড়ায়।এতে অবশ্য  গরু বাহিনীর মধ্যে বিশেষ হেলদোল দেখা যায় না। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এক স্থানীয় বাসিন্দা বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করেননি।
এই রাস্তার পাশের এক চা এর দোকানি জানিয়াছেন যে রোজই বিশাল সংখ্যায় গরু রাস্তার দখল নেয়।এর ফলে সাধারণ মানুষকে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে যারপরনায় অসুবিধার সন্মুখীন হতে হয়। গরু সরিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে কঠিন। সাধারণ সাইকেল বা মোটরসাইকেল এর ক্ষেত্রে রাস্তা দখলকারী গরুদের মাঝখান দিয়েই অতি কষ্টে রাস্তা বের করে নেওয়া অথবা রাস্তার একেবারে ধার দিয়ে কিম্বা পিচ রাস্তার পাশে মাটির উপর দিয়ে চলে যাওয়ার বিকল্প থাকলেও, চার চাকার গাড়ি,লরি-ট্রাক  এমনকি তিন চাকার রিক্সার ক্ষেত্রেও সেই অবকাশ থাকে না। ফলে চরম সমস্যার সৃষ্টি হয়। গরুদের সরাতে জোরে হর্ন দেওয়া নয় বলে জানিয়াছেন অনেকেই। স্থানীয় এক ছাত্রের কথায় শুধু জোরে জোরে হর্ন বাজালেই কার্যসিদ্ধি হয় না , মুখেও হ্যাট হ্যাট শব্দ করতে হয়। অনেক সময় গরুদের সরাতে নানা রকম ভী তিপ্রদর্শক অঙ্গ ভঙ্গিও করতে হয়ে থাকে। এত কিছুর পরেও যে সফলতা আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা অবশ্য  নেই। শিক্ষা-ভবন হোস্টেল এর এক ছাত্রের সহাস্য প্রতিক্রিয়া “হোস্টেলের ব্যালখনি থেকে বা মোড়ের  চায়ের দোকানে বসে প্রায় দেখি যে বিস্তর হর্ন ,মুখে শব্দ ,অঙ্গ-ভঙ্গি, এমনকি কখনো কখনো সামান্য শারীরিক আঘাত করার পরে অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে পথ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে নিরীহ প্রানীটা “ওই ছাত্র আরো বলেন যে এই দৃশ্য দেখে অনেক সময় গরু গুলির জন্যই কষ্ট হয়।
তবে কষ্ট হওয়ার দিন এখন হয়ত শেষ হতে চলেছে।বিশ্বভারতী  কর্তিপক্ষের সাম্প্রতিক কালে জারি করা এক নির্দেশিকা অন্তত সেই আশার বাণীই শুনিয়েছে। নানা জায়গায় খোজ করেও নির্দেশিকার কোনো কপির সন্ধান  পাওয়া না গেলেও সূত্র  এবং সংশ্লিষ্ট মহলের খবর এই যে রাস্তায় শুয়ে থাকা গরুদের সরাতে মৃদু হর্ন ছাড়া আর কোনো প্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করার উপরে কঠোর ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন  কর্তিপক্ষ।
এক কর্মকর্তার কথায় সারাদিন নানা রকম পরিশ্রমের পর এই সময়টা রাস্তায় শুয়ে গরুর দোল একটু বিশ্রাম করে। এই সময় জোরে জোরে হর্ন বাজিয়া ,ভয় দেখিয়া এমনকি অনেক সময় আঘাত করে গরুদের রাস্তা থেকে সরিয়া দেওয়া নিতান্ত অমানবিক কাজ। যা রুখতে এই রূপ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কিন্তু পথ চলতি মানুষের অসুবিধার কি হবে?এই প্রশ্নে নিরুত্তর ঐ কর্মকর্তার নিজের বাড়ি অবশ্য বোলপুর  স্টেশন রোডে। বিশ্বভারতীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারী নিরাপত্তা সংস্থার এক কর্মী জানিয়াছেন যে সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তা থেকে গরু সরাতে হালকা হর্ন বাজানো ছাড়া কেউ অন্য কিছু করলে তাদের বাধা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশিকার ফলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা টহলদারী গাড়িরও যে অসুবিধা হবে তা অবশ্য মেনে নিচ্ছেন এই কর্মী।
জানা গিয়েছে যে নির্দেশিকার আকারে প্রকাশ করা হলেও বিশ্বভারতী কর্তিপক্ষ এই বিজ্ঞপ্তিকে এখনো পর্যন্ত  হিসেবেই গণ্য করছেন।প্রথম দিকে বেশ কিছু দিন পথ চলতি মানুষকে এই বিষয়ে অনুরোধ এবং মৌখিকভাবে সতর্ক করা হবে বলেও জানা গিয়েছে।পথচারীদের এই বিষয়ে অবহিত করতে রাস্তার দুই ধারে অস্থায়ী স্তম্ভেরও ব্যবস্থা অতি শীঘ্র করা হবে। তবে এই রূপ নরম মনোভাবে যদি আশানিরূপ ফল না পাওয়া যায় সেই ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। কি এই কঠোর ব্যবস্থা ? সূত্রের খবর নির্দেশিকা অমান্য করতে হাতেনাতে ধরা পড়লে জরিমানা করার কথা ভাবছেন কর্তিপক্ষ। তবে জরিমানার অঙ্ক নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনরূপ আলোচনা হয়নি বলে জানা গিয়েছে।বিশ্বভারতীর এক প্রাক্তন নিরাপত্তা আধিকারিক এর মতে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে হাতেনাতে ধরা না পড়লে পরে আর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
নিত্যদিন  সন্ধ্যার পরে এই পথে যাতায়াত করা মানুষ এই নির্দেশিকার ফলে নিতান্ত অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন। সুরুল এর এক বাসিন্দা জানিয়াছেন যে তিনি প্রায় প্রতিদিন রাতে ওই পথ দিয়ে বাড়ি ফেরেন।গরু সরিয়া এগোতে যথেষ্ট অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয় তাকে।বিদ্রুপের সুরে তিনি বলেন ” ভালই হলো আর গরু সরাবার ঝামেলা থাকলো না “
তবে এই নির্দেশিকা স্থানীয় পশু-প্রেমীদের মধ্যে বিপুল পরিমান আসার সঞ্চার ঘটিয়াছে।এমনই এক পশু-প্রেমীর সাথে কথা বলে জানা গেল যে তিনি এই রূপ নির্দেশিকার মধ্যে গুরুদেবের আদর্শের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন ,এই নির্দেশিকা মানবিক।তিনি আরো বলেন যে এতে শুধু স্থানীয় পশু-প্রেমী মহলই নয়  দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট পশু-প্রেমীয় এই নির্দেশিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং সমর্থন জানিয়াছেন।সায়েন্স এর মোড় থেকে ঢিল ছোড়া  দুরত্বে অবস্থিত অশোকের হোটেলের এক কর্মচারী  জানিয়াছেন পশু-প্রেম,মানবিকতা ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয় তিনি জানেন না,তিনি শুধু বলতেচান  যে গরুর জমায়েতের ফলে সারা রাস্তা মল-মূত্রে ভরে যায়। এর ফলে রাস্তা আর রাস্তার মত থাকে না। রাস্তা পরিনত হয় গোয়ালে।
আজন্ম শান্তিনিকেতনে বসবাসকারী, বিশ্বভারতীর এক প্রাক্তন অধ্যাপক আবার গরু বাহিনীর রাস্তা দখল নেওয়ার প্রকৃত  কারণের সন্ধান দিয়েছেন।তার মতে এই সব গরুরা হঠাত করে জন্মায়নি। গরু আগেও ছিল এখনো আছে। সংখ্যায় তা আগের থেকে কমে হবে। তার মতে বিশ্বভারতী জুড়ে যে পাঁচিল দেওয়া হয়েছে এ তারই প্রভাব।পাঁচিল দেওয়ার আগে গরুর দোল রাস্তার দুই পাশের মেঠো জমিতে রাত কাটাতো কিন্তু লম্বা পাচিল দেওয়ার ফলে গরুর দোল আর রাস্তার পাশের জমিতে আশ্রয় নিতে পারে না.বাধ্য হয়েই তাদের রাস্তার দখল নিতে হয়।বিশ্বভারতী কর্তিপক্ষ যদিও এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের মতে লম্বা পাঁচিল দেওয়া হলেও জায়গায় জায়গায় গেটের ও ব্যবস্থা করা হয়েছে।এবং এই সকল গেট যে শুধু মানুষেরাই ব্যবহার করে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
তর্ক-বিতর্ক চলছে,কিন্তু এই নির্দেশিকা প্রকৃত পক্ষে কার্যকর হলে পথ চলতি মানুষের যে দুর্দশার সীমা থাকবে না তা সহজেই অনুমেয়।
সব মিলিয়ে এলাকা জুড়ে এক অসন্তোষের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে।রয়েছে উত্তেজনা। এই নির্দেশিকা যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় তবে পরিস্হিতি কি হবে তা সময়ই বলবে।
Tagged with: ,
About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RELATED ARTICLES

Back to Top