Tinpahar
No Comments 310 Views

গোধূলিসন্ধির আলো-আঁধারঃ সাদা-কালো ছবির প্রলম্বিত বিদায়লগ্ন (Black & white Film)

চলচ্চিত্রের উৎসাহী দর্শকদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে নির্বাক যুগের চলচ্চিত্র মাত্রেই সাদাকালো। অথচ চলচ্চিত্র শিল্পের জন্মলগ্ন থেকেই ছবিকে রঙীন করে তোলার বিবিধ প্রয়াসের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যদিও সাদাকালো স্থিরচিত্র বেশ কিছুকাল ধরেই দৈনন্দিন ঘটনা হয়ে উঠেছিল, কিন্তু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রকৃত সাদা-কালোর বদলে ধূসর রঙের নানা মাত্রার ব্যবহারই আদি চলচ্চিত্রের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। চলচ্চিত্রের প্রথম অবস্থা থেকেই তুলি দিয়ে, স্টেনসিল ও এয়ারব্রাশ দিয়ে, এমনকি ছবির প্রিন্টগুলিকে রঙে চুবিয়ে নানা উপায়ে চলচ্চিত্রে রঙ যোগ করার নিরন্তর প্রচেষ্টার হদিশ পাওয়া যায়। একেবারে ১৮৯৫ থেকে শুরু করে ১৯২০-র দশকের মাঝামাঝি অবধি এই জাতীয় নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। যে পদ্ধতিগুলি ছিল, সেগুলি কয়েকটি রঙ তৈরী করতে পারত এবং তার দ্বারা ফ্রেমে উপস্থিত বিশেষ কিছু জিনিসকেই রঙ করা হত। মানুষের চামড়া, বা গাছপালার মত ‘প্রাকৃতিক’ জিনিসকে সাধারনতঃ ধূসরই রাখা হত। কুড়ির দশকের শেষদিকেই বরং দেখা যায় এই ভাবে বাইরে থেকে ছবির প্রিন্টকে রঙ করার প্রচলন কমে আসছে। ততদিনে ছবির দৈর্ঘ্য এবং প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে সেই পরিমাণ ছবির প্রিন্টকে রঙ করার মত দক্ষতাসম্পন্ন কোন পদ্ধতি তখনও আবিস্কৃত হয়নি। কাজেই এই সময়েই বরং প্রকৃত সাদা-কালো ছবির দেখা পাওয়া যায়। অবশ্য অল্প কিছুকালের মধ্যেই টেকনিকালার (Technicolor) পদ্ধতি জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং  তিরিশের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ হলিউডে রঙীন ছবির প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ষাটের দশকের শেষদিকে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সাদা-কালো ছবির বিদায়ঘন্টা বেজে গিয়েছিল। কী চলচ্চিত্র, কী টেলিভিশন উভয় মাধ্যমেই ততদিনে রঙীন ছবির যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে। রঙের এই বিশ্বজোড়া অভিযানের মূল চালিকাশক্তি ছিল হলিউড তথা মার্কিন বিনোদন শিল্প। ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি, জাপান, জার্মানি বা মেক্সিকোর মত যে সমস্ত দেশের বিনোদন শিল্প হলিউডের প্রতিযোগী বা অনুগামী ছিল, তারা সকলেই প্রায় একই সময়ের মধ্যে সাদা-কালো ছবিকে বর্জন করে রঙীন ছবি করতে শুরু করেছে। এই দেশগুলি ছাড়াও আরো অনেক ছোট ছোট দেশের বিনোদন শিল্প রঙীন ছবির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর পিছনে মার্কিন অর্থনীতি তথা ধনতন্ত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য। সারা পৃথিবীর বিনোদনশিল্পে সাদা-কালোর বদলে রঙীন ছবি ব্যবহারের কারণ যত না শৈল্পিক তার চেয়ে অনেক বেশী অর্থনৈতিক বলে মনে হয়। কারণ চাহিদা ও যোগানের উপর নির্ভর করে পৃথিবীর একেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে রঙীন ছবির প্রচলন হতে দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে ষাটের দশকের শেষার্ধ থেকে সত্তরের মাঝামাঝি অবধি সময় জুড়ে বেশ কয়েকটি দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সাদা-কালো ছবির উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়।

এই সময়ে গোটা পৃথিবীর রুপোলি পর্দায় রঙের দখলদারি চললেও আশ্চর্যের বিষয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার অনুগামী সোভিয়েত জোটের দেশগুলিতে আরো এক দশক সাদা-কালো ছবিরই প্রাধান্য ছিল। ১৯৭৪ সাল নাগাদ প্রকাশিত একটি সরকারি বিবৃতিতে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ষাট শতাংশ ছবি রঙীন হয়ে উঠেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রথমতঃ উল্লেখ্য পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই ততদিনে রঙীন ছবি প্রায় একশো শতাংশ যায়গা দখল করে নিয়েছে, অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নে তখনও অন্ততঃ চল্লিশ শতাংশ ছবি সাদা-কালো। দ্বিতীয়তঃ পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে নানা ক্ষেত্রে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের কৃতিত্বের পরিসংখ্যান বাড়িয়ে বলার ঝোঁক ছিল। সে দিক থেকে বিচার করলে মনে হয় সাদা-কালো ছবির আসল সংখ্যা আরো বেশী হওয়া অসম্ভব নয়। এখন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন সোভিয়েত জোটের দেশগুলিতে সাদা-কালোর এই প্রলম্বিত প্রাধান্যের কারণ কী? সোভিয়েত চলচ্চিত্র শিল্পের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই সময়ে ছবির কাঁচা ফিল্ম (Raw Stock) থেকে শুরু করে ছবির প্রদর্শন, মায় সমালোচনা পর্যন্ত গসকিনো (Goskino) কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন। স্বাভাবিকভাবেই যে অর্থনৈতিক শক্তিগুলি পৃথিবীর অন্যত্র উদার বা মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রঙের ব্যবহার চালু করতে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল, সোভিয়েত ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব ছিল নগণ্য। গসকিনোর আমলাদের কাছে ছবির ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলির চাইতে সরকারি আদর্শের আনুগত্য বেশী জরুরী ছিল। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, সামরিক কমিটি, আঞ্চলিক দল সবার কাছে ছবিগুলি আদর্শগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠাই মূল লক্ষ্য ছিল। কাজেই দেখা যাচ্ছে বাকি পৃথিবীর কাছে যা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রশ্ন, সোভিয়েত জোটের দেশগুলির কাছে তা ছিল আদর্শগত প্রশ্ন। গসকিনোর এই জাতীয় মনোভাব সম্পর্কে স্বয়ং আন্দ্রেই তারকভস্কি তাঁর রোজনামচায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

যথেষ্ট পরিমাণ রঙীন ফিল্মের (Color Film Stock) যোগান না থাকা সোভিয়েত জোটের চলচ্চিত্রে সাদা-কালোর প্রলম্বিত প্রাধান্যের একটি মূল কারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের  টেকনিকালার এবং জার্মানির আগফাকালার (Agfacolor) কোম্পানিই সফলভাবে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে রঙীন ফিল্ম তৈরী করত। পৃথিবীর অন্যত্র নানারকম পরীক্ষা চললেও কোনটিই যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ব্যাপারে বিশেষরকম পিছিয়ে ছিল। যুদ্ধের সময় অধিকৃত জার্মানি থেকে আগফা ফিল্ম উদ্ধার করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম সাবট্র্যাকটিভ থ্রি-কালার (Subtractive three-color) প্রযুক্তি হাতে পায়। তার আগে পর্যন্ত তারা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট অ্যাডিটিভ টু-কালার (Additive two-color) পদ্ধতি অবধি পৌঁছতে পেরেছিল। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাকি দেশগুলিতে ছবিতে রঙ ব্যবহারের প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সোভকালার (Sovcolor) সেই পরিমাণ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তাছাড়া বিভিন্ন ব্যাচের ফিল্মের রঙের মধ্যে তারতম্য থাকার ফলে ছবির বিভিন্ন অংশে রঙের সাযুজ্য রাখার সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে গসকিনোর তরফে কোডাক (Kodak) কোম্পানির নেগেটিভ আমদানি করা শুরু হয়। কিন্তু সেই ফিল্মের পরিমাণ ছিল খুবই কম আর দামও ছিল চড়া। কাজেই যে কোন পরিচালক তা ব্যবহার করার সুযোগ পেতেন না। গসকিনোর পছন্দের পরিচালক এবং পছন্দের ছবিতেই একমাত্র এই ফিল্ম ব্যবহার করার সুযোগ ছিল। এই সময়ে তৈরী নাইটস অফ ফেয়ারওয়েল [Nights of Farewell, Jean Dreville and Isaac Menaker; 1966] এবং ওয়ার অ্যান্ড পিস [War and Peace, Sergei Bondarchuk; 1968] এই জাতীয় ছবির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেসব পরিচালক এই সুবিধা পেতেন না, তাদের কাছে দু’টি উপায় ছিল, হয় সোভকালার নয় সাদা-কালো ফিল্ম ব্যবহার করা। অধিকাংশ সোভিয়েত পরিচালক সত্তরের দশকের শুরুতেও সাদা-কালোই ব্যবহার করতেন। কর্তৃপক্ষের তরফেও সাদা-কালোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হত। সারা পৃথিবীতে যখন শৈল্পিক চলচ্চিত্রের প্রবক্তারা সাদা-কালো ছবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে লড়ছিলেন, সোভিয়েত পরিচালকদের তখন রঙীন ছবির জন্যে লড়তে হচ্ছিল। চলচ্চিত্রে যেসব পরিচালক রঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাতঃস্মরণীয় তাঁদের অন্যতম আন্দ্রেই তারকভস্কিকে স্টকার (Stalker, Andrey Tarkovskiy; 1979) ছবি তৈরীর সময় সাদা-কালো ফিল্ম ব্যবহার করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সোভিয়েত দুনিয়ার রুপোর খনিতে যে রুপো উৎপাদিত হত, তার অধিকাংশই চলে যেত সামরিক খাতে। যে সামান্য পরিমাণ গসকিনোর হাতে এসে পৌঁছত তাই দিয়ে সোভকালারও খুব বেশী তৈরী করা যেতনা। এই অবস্থায় অনেক পরিচালকই সত্তর দশকের অনেক বছর পর্যন্ত সাদা-কালো ছবি করেছেন। তবে সাদা-কালো ছবির শিল্পগুণ, গুরুত্বের দাবি এবং কম খরচে ছবি করার সুযোগের জন্য এঁদের কাছে তার বিশেষ আবেদন ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে সাদা-কালোর এই প্রাধান্য ছিল জোগান-নির্ভর। যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়নে হলিউড বা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের প্রবেশ প্রায় ছিলই না, তাই রঙীন ছবির তেমন চাহিদাও ছিল না। কোন বছরেই আমদানিকৃত হলিউডি ছবির সংখ্যা দশ পেরোতো না। যে কটি হলিউডি ছবি আমদানি করা হত, সেগুলিও বহু বছর আগের ছবি। ষাটের দশকে কিছু চলচ্চিত্র সংসদ আন্তর্জাতিক ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলেও তার সদস্যসংখ্যা ছিল সীমিত এবং পরের দশকে পৌঁছবার আগেই বিভিন্ন আদর্শগত বিরোধের কারণে তাদের বিলুপ্তি ঘটে। কাজেই রঙীন ছবির সাথে পরিচিতি থাকলেও পরিচালকদের উপর সাদা-কালো ছবি ছেড়ে রঙের দিকে যাবার কোন চাপ ছিল না। সোভিয়েত জোটের বাকি দেশগুলির অবস্থা সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুগামী ছিল, যদিও পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলি তুলনায় অনেক উদার মনোভাব দেখায়। কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানেও অনেক পরে রঙীন ছবির প্রসার ঘটে।

ভারত যদিও সে অর্থে সোভিয়েত জোটের দেশ ছিল না তা সত্ত্বেও এখানে বহুদিন পর্যন্ত সাদা-কালো ছবিই বেশী তৈরী হত। আজকের ঝলমলে বলিউড-মার্কা ছবি দেখে অনুমান করা শক্ত ভারতে রঙীন ছবি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বাকি বিশ্বের তুলনায় অনেক পরে। বিশেষতঃ যেখানে ভারতে প্রতি বছর বিশালসংখ্যক ছবি তৈরী হয়, সেখানে সত্তর দশকের মাঝমাঝি অবধি প্রায় সমস্ত ছবি সাদা-কালোয় তৈরী হওয়াটা কিছুটা আশ্চর্যের। ভারতীয় চলচ্চিত্রের আভ্যন্তরীণ অবস্থার দিকে তাকালে এর কয়েকটি কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। যদিও পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই টেকনিকালার পদ্ধতি ব্যবহার করে মেহবুব খান, আন [Aan, Mehboob Khan;1952] তৈরী করেন কিন্তু তাতে খরচ এতই বেশী ছিল যে খুব বড় প্রযোজনার ক্ষেত্রেও তা বিশেষ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৪ সালে ভারতে গেভার্ট (Gevaert) কোম্পানির কারখানা স্থাপিত হবার পর কিছুদিন গেভাকালার (Gevacolor) ব্যবহার হয় কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় আর কোন ছবিতে তার ব্যবহার দেখা যায়না। সম্ভবতঃ গেভাকালার পদ্ধতি ভারতে খুব একটা সফল হয়নি। ১৯৭৩-এর আগে ভারতে রঙীন ফিল্মের কোন দেশীয় ব্যবস্থা আসেনি। ষাটের দশকের মাঝমাঝি থেকে বেশ কিছু ছবি ইস্টম্যান কালার (Eastman Color) পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করলেও ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানির ফিল্ম রপ্তানি করতে প্রায় আড়াইশো শতাংশ রপ্তানি শুল্ক দিতে হত। এই পরিমাণ শুল্ক আদায়ের পিছনে ইন্দিরা গান্ধীর অধীন কংগ্রেস সরকারের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব জার্মানিতে তৈরী অরভকালার (Orwocolor) ব্যবহার করতে পরিচালকদের উৎসাহিত করা। ফলস্বরূপ সাদা-কালোর ছবিই দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে টেলিভিশন চলচ্চিত্রের বড় প্রতিযোগী হয়ে ওঠে। টেলিভিশনের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে। ভারতে যেহেতু দূরদর্শন সেভাবে বিস্তৃতি লাভ করেনি এবং আশির দশকের আগে জাতীয় স্তরে রঙীন সম্প্রচার শুরুই হয়নি, তাই ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সরাসরি এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। ভারতে বিপুল সংখ্যক ছবি তৈরী হবার কারণে পৃথিবীর অন্য দেশের মত এখানে হলিউডের প্রভাব সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেনি। ভারতের দর্শকের খুব অল্প অংশই হলিউডি ছবির সাথে পরিচিত ছিলেন। ফলে বাজারগত বা চাহিদাগত কোন চাপ পরিচালকদের উপর ছিল না, বরং জোগানের দিক থেকে কতগুলো সুবিধাই ছিল। হলিউডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রঙের ব্যবহার হত মিউজিকাল ঘরানার ছবিতে। ভারতে প্রায় সব ছবিই সে অর্থে মিউজিকাল হলেও তিস্‌রি মঞ্জিল [Teesri Manzil, Vijay Anand; 1966] জাতীয়  দু’একটি বিরাট প্রযোজনার ছবি ছাড়া ১৯৭৩-এর আগে রঙীন ছবির বহুল প্রসার ঘটেনি। সারা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ সাদা-কালো ছবিকে বর্জন করলেও তাই এই রকম কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে সে বিদায়লগ্ন আরো কিছু প্রলম্বিত হয়। তবে শেষবিদায়ের পরেও স্মৃতিটুকু থাকে। রঙীর ছবির এই ঝলমলে নিয়ননিশিতেও তাই মাঝে মাঝে দু’একটি সাদা-কালো ছবি এদিক সেদিক নক্ষত্রের মত ফুটে ওঠে। আর আছে স্মৃতির ভার, রঙীন ছবির মধ্যেও তাই অতীত দেখাতে, ফ্ল্যাশব্যাকের মত কয়েকটি শৈল্পিক ক্ষেত্রে আজও সাদা-কালোর ব্যবহার হয়। অবশ্য ডিজিটাল ছবির যুগে সাদা-কালো ছবির আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্রমশঃই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। যতদিন সে সম্ভাবনা আমাদের কম্প্যুটার বা রুপোলি পর্দা্র আলো-আঁধারীতে ফুটে না উঠছে, ততদিন আমরা এই সাদা-কালো গোধূলীর সাক্ষী হয়েই থাকি।

 

তথ্যসূত্রঃ  ক্রোমাটিক সিনেমাঃ আ হিস্ট্রি অফ স্ক্রীন কালার, রিচার্ড মিসেক, উইলি-ব্ল্যাকয়েল, ২০১০

(Misek, Richard. Chromatic cinema : a history of screen color. West Sussex: Wiley-Blackwell, 2010.)

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top