Tinpahar
No Comments 14 Views

ঘড়ি

আমার ছোটোবেলার ভাড়া বাড়িতে খুব বেশি যন্ত্র ছিল না । বিদ্যুৎচালিত আলো-পাখা বাদ দিলে ব্যাটারিচালিত একটা রেডিও ছিল আর ছিল দু-দুটো ঘড়ি । একটা বাবার, অন্যটা দেওয়ালের । রেডিওর সঙ্গে ঘড়িদুটোর সম্পর্ক ছিল খুবই গভীর, আত্মিকও বলা চলে । রোজ সকালে আমার বাবা একবার করে সেই সম্পর্ক ঝালাই করে নিতেন । আমার ঘুম ভাঙত রেডিওর শব্দে । সকালে রেডিও স্টেশন খোলার চেনা বাজনার সুরে আমি চোখ মেলতাম । একটা গম্ভীর গলার লোক রেডিওর ভেতর থেকে বলত, ‘এখন স্টুডিওর ঘড়িতে পাঁচটা ঊনষাট মিনিট বেজে তিপান্ন সেকেন্ড’ । বাবা সেই রেডিও-ঘড়ির কথা মতো মিলিয়ে নিত হাতঘড়ি, দম দিত তাতে । দেওয়াল ঘড়িতে অবশ্য রোজ দম দিতে হত না, সপ্তাহে একদিন দিলেই চলত । তবে রেডিওর সময়ের সঙ্গে দেওয়ালের সময় মিলছে কি না তা মিলিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার । কোনও দিনই মিলত না । পুরনো দেওয়াল ঘড়িটারোজই একটু করে স্লো হয়ে যেত । কোনও দিন চার মিনিট, কোনও দিন পাঁচ মিনিট । আমি মনে রাখতাম আজ রেডিওর থেকে দেওয়াল চার মিনিট  পিছিয়ে আছে, আজ পাঁচ মিনিট পিছিয়ে আছে । এই ভাবে পেছোতে পেছোতে সপ্তাহের শেষের দিকে, সাধারণত রবিবার ঘড়ি যেত বন্ধ হয়ে । তখন বাবা দেওয়াল ঘড়িতে দম দিতে উঠত ।

দেওয়াল ঘড়িটা ঝুলত আমাদের শোওয়ার ঘরে, খাটের মাথায় । এই খাট আর ঘড়ি দুই বাবা-মায়ের বিয়ের সময়ের । তখন আমার জন্ম হয়নি । বাবা লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে রবিবারের সকাল-দুপুরে খাটের কাঠের ওপর দাঁড়াত, হাত দিয়ে শরীরের ভর রাখত দেওয়ালে । ঘড়ির ডালা খুলে দম দিয়ে আবার চালু করে দিত দেওয়ালের সময় । আমি তখন নিচে, বাবার দম দেওয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে । বলতাম, এখন তোমার ঘড়িতে এগারোটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট হয়ে চল্লিশ সেকেন্ড । সেকেন্ডটা বলতাম , তবে বলা ছিল খুবই শক্ত । সেকেন্ডের কাঁটাটা তিরতির করে বয়ে যেত । আমার কথা মতো বাবা মিলিয়ে দিত দেওয়ালের সময়। পরদিন অবশ্য আবার তা স্লো হয়ে যেত, সকালের রেডিওর সঙ্গে মিলত না ।

আমাদের ভাড়া বাড়িতে আরেকটা যন্ত্র ছিল । সে বিদেশি । তখন কজনের বাড়িতেই বা বিদেশি জিনিস থাকত । তাই অচল হলেও তার সযত্ন বাসস্থান ছিল আলমারির লকার । আমার মায়ের সেজোমামা কানাডায় থাকতেন । আমি তাঁকে চোখে দেখিনি , আমার দাদাও দেখেনি । তিনি নাকি আগে বছরে একবার করে দেশে আসতেন । দেশে এলে নানা জনের জন্য নানা উপহার আনতেন । ভাগ্নিদের জন্য ঘড়ি এনেছিলেন । মা সেই ঘড়িটা এক দু-বার পরেছিল । বাড়িতে তো আর ঘড়ি পরে থাকা যায় না , আমার মা অফিসেও যেত না । তাহলে কখন ঘড়ি পরবে ? বিয়ে বাড়িতে ঘড়ি পরে গিয়েছিল । মায়ের ইচ্ছে ছিল আমরা সবাই মিলে দূরে কোথাও একটা যাব – পুরী বা দীঘা , তখন মা ঘড়ি পরবে । কিন্তু সেই সমুদ্রযাত্রা  হতে এত দেরি হল যে ঘড়িটা তার আগেই গেল বন্ধ হয়ে । বিদেশি ঘড়ি , তাই দেশের ঘড়িওয়ালারা সেটা মেরামত করতে চাইল না । যারা রেখে যেতে বলল তাদেরকে মা ভরসা করে দিতে পারল না । মায়ের খালি মনে হত, রেখে যেতে বলছে মানেই ঘড়ির ভেতরের দামি বিদেশি স্পার্টস সব বের করে নেবে । তারপর ভরে দেবে রদ্দি দিশি স্প্রিং । সুতরাং সেই অচল বিদেশি ঘড়ি সযত্নে ভরে দেওয়া হল আলমারির লকারে । মায়ের সেজোমামা এই ঘড়িকাণ্ডের পর কখনও এদেশে আসেনি । ফলে তাঁকে এই না-চলা ঘড়ির কথাবলাই হয়নি ।

আমার অবশ্য সেই আশ্চর্য অচল ঘড়ি মাসে একবার দেখতে খুবই ভালো লাগত । মাসের প্রথম দিন কয়েকের মধ্যে বাবা রুমালে বেঁধে ট্রেজারি থেকে মাইনে আনত । বাবাদের মূল অফিস ছিল কলকাতায় । তারা পুরুলিয়ার ট্রেজারিতে কেমন করে জানি মাইনে পাঠিয়ে দিত । বাবা রুমালে বেঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগে সেই টাকা ঢুকিয়ে দুপুর বেলা সাইকেল চালিয়ে বাড়ি চলে আসত । মা আর বাবা খাটের ওপর বসে সেই টাকা ভাগ করত । বাড়িভাড়া ২২৫, মঙ্গলাদি ১০, মাসকাবারি ৫০০, বাজার ৫০০ এইভাবে ভাগাভাগি চলত । তারপর সেই ভাগাভাগির টাকা কাগজে রাবার ব্যান্ড দিয়ে আলাদা আলাদা করে রাখা হত , ঢোকানো হত লকারে । সেই সময় আমি বন্ধ বিলিতি হাতঘড়িটা একবার দেখতে চাইতাম । মা বের করে দিত । কাঁটাদুটো থমকে আছে । দেওয়াল ঘড়িতে সময় কত স্লো তা আমি মনে মনে একবার বলে নিতাম ।

রেডিও শুনতে শুনতে, ঘড়ির সময় মেলাতে মেলাতে একবার আমার খুবই ঘড়ি পরার শখ হয় । কিন্তু পাব  কোথায় ? বাবা যে রেডিওটা চালিয়ে সময় মেলাত সেই রেডিওটা মার্ফি কোম্পানির । মুখে আঙুল দিয়ে একটা ছেলে রেডিওতে ছবি হয়ে বসে থাকত । তারও কোনও ঘড়ি ছিল না, আমারও না । ওই ছেলেটার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে বেশ হত । তাহলে দুজনে মিলে ঠিক একটা ঘড়ির ব্যবস্থা করে নিতাম । ওতো রেডিওতেই থাকে, তাই আমাদের দুজনের ঘড়ির সময় খুব সহজেই রেডিওর সঙ্গে মিলে যেত । ছেলেটার অবশ্য খোঁজ পাওয়া গেল না । তখন আমি কী আর করি! একটা ঘড়ি আঁকতে বসলাম । হাতের ওপর নীল কালির পেন দিয়ে আমার ঘড়ি আঁকা । একবারে আঁকা যায় না । লাইন বেঁকে যায় । বড়ো কাঁটা ছোটো কাঁটা গুলিয়ে যায় । সেকেন্ডের কাঁটা আঁকতে ভুলে গিয়েছিলাম । পরে আঁকলাম ।তাছাড়া এ ঘড়ির কাঁটা তো চলে না ।  এক জায়গায় থমকে থাকে । সেই আঁকা হাতঘড়ি নিয়ে আমি একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম । অমনি দেওয়াল ঘড়ি আমার ঘুমের মধ্যে স্লো হয়ে গেল । বাবার হাত ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা তিরতিরিয়ে চলতে লাগল । রেডিও থেকে বাইরে এল সেই ছেলেটা । সে আমার আঁকা ঘড়ির কাঁটাটাকে একটু একটু করে ঠেলতে লাগল । বলল, ‘এ তো দিশি ঘড়ি , আমি এটাকে ঠিক চালিয়ে দেব ।’  তারপর সত্যি সত্যি আমার আঁকা হাত ঘড়ি চলতে লাগল, তাতে বাজতে লাগল ‘একটা বেজে , কুড়ি মিনিট হয়ে চব্বিশ সেকেন্ড’ । এই সব কাণ্ডের মধ্যে কেবল অচল হয়ে রইল, আলমারিতে রাখা মায়ের সেজো মামার দেওয়া বিলিতি ঘড়ি । আমার রেডিও শোনা লুঙ্গিপরা বাবা আমার  স্বপ্নে অনেক চেষ্টা করেও সেই বিলিতি ঘড়িকে কিছুতেই  চালু করতে পারল না ।

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top