Tinpahar
No Comments 12 Views

ডাস্ট্‌বিন্‌ (Dustbin)

ঋতজা চৌধুরী (Ritoja Chowdhury)
Japanese Department , Visva-Bharati University

একটা শহর, বাইপাস এর ধারে একটা ফুটপাথ, কিছু ঝুপড়ি ঘর। তারই পিছনে পাঁচিলের ওধারে শ্বেতপ্রাসাদসম সব ফ্ল্যাট। হাইওয়ের উপর দিয়ে উড়ে আসা গাড়িগুলোর মধ্যে থেকে একটা নীল-হলুদ বাস থামল এই ‘নীলাচল অ্যাপার্ট্‌মেন্ট’ এর সামনে।
সঙ্গে হর্ন-এর বিকট শব্দ আর প্রচুর কচিকাঁচার মিশ্রিত কলরব। দরজা খুলতে না খুলতেই নামলো একদঙ্গল ছেলেমেয়ে। এদের বয়স খুব বেশী হলে আট থেকে দশ বছর। বাস থামলেও কচিগলায় ‘We shall overcome’ গানটা কিন্তু শোনা যেতেই লাগল। তারই মধ্যে থেকে ভেসে এলো ‘YOOO’, ‘see you’… জাতীয় নানান শব্দ। বাস আবার স্টার্ট নিয়ে বেরিয়ে গেল। সাত-আট জন শিশুদের এই দলটি ছুটল ‘নীলাচল’-এর গেটের দিকে। এদেরই মধ্যে থেকে উড়ান ছুটল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তার মা, মহিমার দিকে। ‘ইস, uniform-এর কি দশা ! কেড্‌স্‌টা কি আর পরার যোগ্য আছে!! অসভ্য বাঁদর !’ কাছে যেতেই মায়ের বকুনি। অবশ্য উড়ান এর ‘উড়ান’-এ কোন বাধা এলো না। পথে কেবল স্কুলব্যাগটা মাকে ধরিয়ে দিয়েই সে মিলিয়ে গেল সাদা অট্টালিকা গুলোর ফাঁকে। দূর থেকে মহিমার গলা শোনা যেতে থাকল, ‘এক্ষুনি উপরে যাবি কিন্তু উড়ান…!’

এ তো গেল ‘নীলাচল’-এর ভিতরের দুনিয়া। ‘নীলাচল’-এর বাইরে, ব্যারিকেট-এর ওপারেও একটা দুনিয়া রয়েছে কিন্তু ! সেইই যে, সেই ফুটপাথটা, ঝুপড়িগুলোর কথা মনে আছে তো? সেখানেই একটা বড় ডাস্ট্‌বিনের পাশে বহু কলহের পর বাসা জুগিয়েছে পঞ্চু-গৌরীর চারজনের ছোট্ট সsসার। বেলা বারোটা নাগাদ গৌরীর চিৎকার… ‘এই যে শুনছো? মালু যে এখনো ফিরল না। প্রতিদিন এই এক ঝামেলা… বলি এবার ইস্কুল যাওয়াটা থামালে হয়না?? ও না ফিরলে যে আমি কাজে যেতে পারিনে! মাধু কে দেখবে কে ?’

দরজা থেকে ভেসে আসে একটি মেয়ের কোমল কণ্ঠস্বর- ‘ওর দিদি দেখবে, আবার কে ! আমি তো কখন এসে গেছি, মা !’ মেয়েটি হল পঞ্চু-গৌরীর বড় মেয়ে, মালতী। বয়স, দেখে তো মনে হয় বছর বারো । এখনো অবধি সে স্কুলে যায়। ভাই মাধব ওর থেকে প্রায় বছর পাঁচেক ছোট।

গৌরী কাজে বেরোতেই ছেঁড়া কতকগুলো বই-খাতা, আর পেন্সিল সমেত ময়লা রঙের সাইডব্যাগটা রেখেই মালতী ছুটল ডাস্ট্‌বিনটার দিকে। নানা আবর্জনার মাঝে সে দেখতে পেল একটা ভাঙা সানগ্লাস, কয়েকটা বোতল আর একজোড়া ছেঁড়া সাদা জুতো। সানগ্লাসটা এনে ভাইকে দিল। মাধু তো বেজায় খুশি। আর সেই জুতোজোড়া ও ভালো করে ধুয়ে, পরিষ্কার করে পায়ে গলিয়ে দেখল, বেশ ভালই পায়ের মাপের হচ্ছে তো! কি মজা, আজ একটা নতুন জুতো হল! পঞ্চু একজন রিক্সাচালক। বাইপাস এর ওধারেই খদ্দেরের অপেক্ষায় বসেছিল। মালতী বাবাকে দূর থেকেই বলল- ‘যদি কোন সাদা রঙ পাও, তাহলে একটু আনবে, বাবা ?’

পঞ্চু – ‘বেস্, দেখব গা…।’

বিকেল নাগাদ উড়ান আর তার দলবল অ্যাপার্টমেন্টের মাঠে খেলা করে। শীতকাল। চারটের সোনালী রোদ হেলে পড়ে গায়ের উপর। খেলতে খেলতে বলটা হঠাৎ গিয়ে পড়ল ব্যারিকেটের ওপারে। ব্যস্! বেরোতেই হল উড়ানকে। কোন্ একটা ডাস্টবিনের মধ্যে গিয়ে ঢুকল বলটা। ডাস্টবিনটার ধারে যেতেই বলটা পেয়ে সে দেখল, একজোড়া কেড্‌স জুতো। অপরিষ্কার ধরনের সাদারঙ করে সেই পড়ন্ত রোদে ডাস্টবিনের গায়ে হেলান দিয়ে শুকোতে দেওয়া আছে। একটু নিচু হতেই উড়ান বেশ বুঝল, এ জুতোজোড়া তো তারই !! ঐ তো সেই ট্যাটুর আদলে তারই নিজের হাতে সারা দুপুর জেগে আঁকা সেই বিকট চিহ্নটা! হঠাৎ পিছন থেকে একটা ধমক- ‘এই, কে রে তুই? অমন করে আমার নতুন জুতোয় নজর দিচ্ছিস ?!’ উড়ানের উদ্ধত উত্তর, ‘ওয়ে ওয়ে! জুতোটা আমার। তুই কে? চোর কোথাকার !! দাঁড়া… এক্ষুনি মা কে বলছি। তারপর দেখ্‌ তোর কি হয়।’

এইবার ক্ষেপে উঠল মালতী- ‘কাকে তুইতোকারি করছিস রে তুই? ভয় দেখাচ্ছিস? জানিস, আমার একটা তোর বয়সী ভাই আছে? তোর থেকে অনেক বড় আমি! স্কুলে যাস না,নাকি? কিসুই তো শিখিসনি দেখছি !’ উড়ান একটা দারুণ বলিষ্ঠ জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু কি একটা দেখে যেন চুপ করে গেল…রীতিমত হতবাক উড়ান ! মালতীর চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন- ‘কী? এবার উত্তর দে ! খুব তুইতোকারি করা হচ্ছিল, না? কি দেখছিস অমন করে ?’ এই বলেই সে তাড়াতাড়ি জুতোজোড়া হাতে নিয়ে পিছনে ঘুরে তাকায়। মেনরোডে দাঁড়িয়ে গেছে অনেকগুলো গাড়ি। কিছু লোকের ভিড়ও জমে গেল। তারই মাঝে একটা স্টেটবাসের গায়ে ছিটকেছে রক্ত। অবশ্য রক্ত কাকে বলে মালতী খুব চিনেছে। বছরখানেক আগে, তখন মালতী আরো অনেক ছোট, বাবার সাথে মায়ের হাত ধরে শেষবারের মত দেখে এসেছিল সে তার প্রিয় কাকা-কাকিমা কে। গুলিতে ছারখার হওয়া সেই রক্তাক্ত মৃতদেহ। সেই গ্রাম…সেই লাল এর বন্যা! আজও ভুলল না মালতী।

কিন্তু এখানে আবার কে মরল! দৌড়ে দেখতে যেতেই দেখল, এখনো একটু নড়ছে মাধুর রক্তাক্ত দেহটা। তার মাথাকে কোলে রেখেই জড়িয়ে ধরল মালতী। মা এখনো ফেরেনি, বাবাও বোধহয় খদ্দের পেয়ে বেরিয়েছে কোথাও। একটু দূরে পড়ে আছে রক্তমাখা সানগ্লাসটা।

সূর্য অস্ত যায়। উড়ানের মা ছুটে এসেই উড়ানকে কোনোক্রমে চোখ ঢেকে ফ্ল্যাটের ভিতরে নিয়ে চলে গেল। যেতে যেতে উড়ান বলে, ‘দ্যাখো না মা, উইইই যে মেয়েটা, কাঁদছে, ও না আমার জুতো চুরি করেছে !’ মহিমা, ‘আরে ধুর বোকা! ঐ কেডস্ টা তো আমিই ডাস্টবিনে ফেলে আসতে বলেছিলাম। বাবা আবার একটা কিনে দেবে, সোনা। তোকে ওদের ওখানে যেতে কে বলল !’

তারপর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে। জীবনসংগ্রামে উড়ান জানিনা কি করল, তবে মালতী হল একা। মা-বাবা মেনে নিল না তার সেই ভুল। বিয়ে হয়ে যায় চোদ্দ বছরেই। স্বামীর মাধ্যমেই সে প্রেরিত হয় গুজরাট, পরে লখ্‌নঊ-এ।

*

আবার একটা ফুটপাথ। অনেক লোকের ভিড়েই তাল মিলিয়ে হাঁটছে একটি মেয়ে। পরনে রঙবেরঙের ঝকমকে শাড়ি। হাতে একটা রক্তগোলাপ নাচিয়ে হাঁটছে সে। তার নাম কী? কেউ জানে না। মেয়েটি মনে ভাবে- সে চুরি করেনি, উড়ানভাই তো তাকে ভুল বুঝেছিল সেদিন। বাবা মাও বিশ্বাস করল না, বুঝল না তাকে। সে চুরি করেনি মাধবের প্রাণ। কিন্তু এখন সে চুরি করে। দিনের আলোয় চুরি করে কত লোকের হৃদয়। আর কলোনির গায়ে সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে এলেই সেইসব মানুষরা হয়ে ওঠে এক একটা জলন্ত পিপাসু। তৃষ্ণা মেটাতে চুরি করে তাকে। হয়তো, এখন সে এই সমাজেরই ডাস্টবিনের এক “নষ্ট মেয়েমানুষ” ।

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top