Tinpahar
No Comments 9 Views

” নকল হইতে সাবধান !!!”

মানুষের মানুষ দেখার আগ্রহ বহু দিনের, কারোর কিছু কম কারো বেশী। কিন্তু দেখতে চাইলেই মিলছে কই !

সাধারণ মানুষ যে ধরনের “মানুষ” দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকে, “যাদের” দেখা পাওয়া যাচ্ছে শুনলে ভিড়  জমায় তাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের বিষয় হলেও সম্ভাবনার পাল্লাটা দেখা পাওয়ার দিকেই কিছুটা হলেও ভারী।
কিন্তু এই ভারতেই এমন এক বিশেষ ধরনের মানুষের বাস যাদের দেখতে সাধারণ মানুষকে পাড়ি দিতে হয় সুদূর আন্দামান দ্বীপ পুঞ্জে।  জাড়োয়াদের দেশে।
আন্দামানের আদিবাসী জনজাতি গুলির মধ্যে অন্যতম হলো এই জাড়োয়ারা মূলত দক্ষিন আন্দামানের পশ্চিম ভাগে ও মিডল আন্দামানে এই জনজাতির বাস। সংখ্যায় এরা খুব বেশি হলে ৪০০।
আন্দামান ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ এই জাড়োয়াদের দর্শন পাওয়া কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে ভাগ্য পরীক্ষারই সামিল।
একটা সময় ছিল যখন চাইলেই এদের দেখা পাওয়া যেত। খাবার, জামাকাপড়ের মত জিনিস পত্র দিলে তো আর কথায় নেই।
ফলে তথাকথিত সভ্য মানুষ জাড়োয়াদের আর “মানুষ” ভাবার অবকাশ পায়নি। ফলত পরিস্থিতি একটা সময় এমন হয়ে ওঠে যখন খাদ্যের বিনিময়ে নাচ দেখাতে বাধ্য করার  মত ঘটনাও ঘটে যায়।
বিপত্তিটা এখানেই।পর্যটকদের লাগাম ছাড়া আবদার ,বিতরণ করা নানা ধরনের ভালো-মন্দ খাবার , পোশাক-আশাক  ইত্যাদি সভ্য সমাজের আরো এমন নানান কিছু এত অতিমাত্রায় জাড়োয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো যে , স্বাভাবিক ভাবেই তাদের স্বাধারণ জীবন যাত্রায় তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করলো।
কিছু সহানুভূতিশীল  মানুষ যে ছিল না এমনটা নয়। কাজেই সভ্য মানুষের বন্য মানুষদের সাথে যা খুশি তাই করার মানসিকতায় দাড়ি টানা না গেলেও ক্ষতিকর মেলামেশাটা বন্ধ করা গেল।
অল্প বিস্তর নিয়ম-কানুন সবসময়ই ছিল,২০০৮ সালে তা আরো একবার কঠোর ভাবে বলবৎ করা হলো।
সেই বছর থেকেই জাড়োয়া দেখা আর মর্জি মাফিক থাকলো না হয়ে গেল ভাগ্য মাফিক। কপালে থাকলে জুটবে না হলে স্রেফ জঙ্গল সাফারি। কঠিন নিয়মের গেড়োই বর্তমানে জাড়োয়া অধ্যুসিত অঞ্চলে পা রাখা তো দূরঅস্ত গাড়ির গতি ৪০ কি.মি./ ঘন্টা র নিচে নামানোর জো নেই।
বাড়াটাঙ অঞ্চলের যে ৫০ কিলোমিটার রাস্তা জাড়োয়া দর্শনের জন্যে প্রসিদ্ধ সেই রাস্তায় দিনে ৩ বার কনভয় এর মাধ্যমে যাতায়াত করা যায়। এই ৫০ কিলোমিটার পথে যাতায়াতের সময় যদি জাড়োয়া জনজাতির কোনো সহৃদয় ব্যক্তি রাস্তার ধারে দৈবাত চলে আসেন তাহলে আপনার কপাল ভালো। দেশে ফিরে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন ” জাড়োয়া দেখেছি ” !
কিন্তু ছবি তলার চেষ্টা মাত্র করবেন না। জরিমানা থেকে হাজতবাস পর্যন্ত হতে পারে। যথেষ্ট পরিমানে ছবি ইন্টারনেটে দেওয়া আছে,কাজেই ও নিয়ে ভাবনা নেই। আক্ষেপ থেকে যাবে যদি আন্দামান সফরে জাড়োয়াদের দেখা না মেলে।
কাজেই জাড়োয়া অধ্যুসিত  অঞ্চলে গাড়ি থামানোর উপর কঠোর নিষেধাজ্গাই বলুন আর, তাদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত করা কঠিন নিয়ম গুলির যাত্রা পথ খুব একটা মসৃন যে নয় তা বলাই বাহুল্য। শোনা যায় জাড়োয়াদের ও পর্যটকদের সুরক্ষার স্বার্থে গাড়ি পারাপারের নির্দিষ্ট সময় গুলিতে জাড়োয়াদের সরকারের পক্ষ থেকে রাস্তার ধারে না আসতে অনুরোধ করা হয়ে থাকে।
এমত পরিস্থিতিতে জাড়োয়াদের দর্শন পাওয়া যে কত কঠিন তা সহজ অনুমেয়। কিন্তু তা বললে চলবে  কেন?নামী-দামী আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা থেকে শুরু করে মালিক- গাইড – গাড়ির চালক একই ব্যক্তি এহেন ক্ষুদ্র পর্যটন সংস্থা পর্যন্ত সকলের প্যাকেজেই জাড়োয়া দেখানোর প্রোগ্রাম থাকবেই থাকবে।
কিন্তু জাড়োয়াদের দেখা পাওয়া যে একপ্রকার ভাগ্যের খেলা তা হাজার হাজার টাকা খরচা করে ঘুরতে আসা পর্যটকদের দলই বা শুনবে কেন !
ফল সরূপ এই নিয়ে পর্যটন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে পর্যটকদের মনোমালিন্য হয়ে উঠলো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অন্যতম আকর্ষণের দেখা পাওয়া অনিশ্চিত ফলে পর্যটকের সংখ্যাতেও তার প্রভাব পড়তে বিশেষ সময় লাগলো না। পর্যটন ব্যাবসায় হতে লাগলো অল্প বিস্তর ক্ষতি।
সম্প্রতি এই বিষয় নিয়ে আন্দামান তথা ভারতের পর্যটন সংস্থা গুলির বেশ কিছু সংগঠন সরকারের কাছে সমাধান সূত্রের খোঁজে দরবার করে। আন্দোলনের হুমকি যে ছিল না এমনটাও নয়। আর ভ্রমন পিপাসু মানুষ জনের মধ্যেও চাপা আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এহেন পরিস্থিতিতে সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হয় এক আশ্চর্য সমাধান সূত্র। বিষয়টা খুবই সোজা ও সহজ। বাড়াটাঙ অঞ্চলের যে ৫০ কিলোমিটার রাস্তার দুই ধারে  জাড়োয়াদের দেখা মিলত সরকারি নিয়ম অনুযায়ী  সেই পথে গাড়ি থামানো যায় না, গাড়ির গতিবেগ থাকে ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার ফলে জাড়োয়াদের খুব কাছ থেকে পরখ করে দেখার এখন আর উপায় নেই। আর ঠিক এই সুবিধাটিকে কাজে লাগিয়েই সফলতা পাবে সমাধান সূত্রটি।
 
কি এই মহার্ঘ সূত্র ? সরকার থেকে কিছু লোকজনকে অবিকল জাড়োয়াদের মত সাজিয়ে গাড়ি পারাপারের নির্দিষ্ট সময় গুলিতে রাস্তার দুই ধারে ইতস্তত ভাবে ঘুরে বেড়াবার ব্যবস্থা করা হবে। এতে পর্যটক সাধও মিটবে আর জাড়োয়াদের সুরক্ষার দিকটিও সুনিশ্চিত হবে।
বিশেষ সূত্রের খবর, এই কাজের জন্যে বিদেশ থেকে বিশেষ ভাবে বরাত দিয়ে আনানো হচ্ছে নানা মাপের “জাড়োয়া কস্টিউম”।
নকল ও আসল জাড়োয়াদের যাতে তফাৎ করা না যায় সেই দিকে লক্ষ্য রেখে জাড়োয়াদের হাটা চলা থেকে শুরু করে জাড়োয়া জীবন যাপন সমন্ধে এই নকল জাড়োয়াদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।কর্তিপক্ষের তরফে এদের “over-acting” করতেও নিষেধ করা হয়েছে। সূত্রের খবর এই সমগ্র বিষয়টি  পরীক্ষা মূলক ভাবে একাধিক বার করেও দেখা হয়ে গিয়েছে, আর তাতে আশাপ্রদ ফল মিলেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের এক কর্তার সাথে কথা বলে জানা গেল, নকল জাড়োয়াদের ঘুরে ফিরে বেড়াতে দেখে পর্যটকদের উত্সাহের বাধ ভেঙ্গে পড়ে। তবে এই পথে বহু বছর ধরে যাতায়াত করেন এমন কিছু অভিজ্ঞ গাড়ির চালকের কোচকানো ভ্রু পর্যটন দপ্তরের চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
তবে এই বিষয়ে সবচেয়ে আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন “নকল -জাড়োয়ার” রোলে সফল ভাবে উর্তীর্ণ বলিউডের এক সাইড এক্টর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি জানান পরীক্ষা মূলক ভাবে বিষয়টিকে রূপ দেওয়ার সময় খুব কাছাকাছি গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। কিন্তু এরপর পর্যটকদের গাড়ির কনভয় যাতায়াতের সময় যখন তাদের রাস্তার ধরে দাড়িয়ে জাড়োয়ার অভিনয় করতে হবে তখন যদি কোনো ভাবে আসল জাড়োয়াও ওই একই জায়গায় চলে আসে তখন তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। আর এই সাজ এতোই নিপুন যে কে বলতে পারে নকল-জাড়োয়াদের বন্ধু ভেবে আসল জাড়োয়ারা তাদের গভীর জঙ্গলে নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করবে না !
তবে চেষ্টা করেও এই বিষয়ে সরকারি কোনো প্রতিনিধির মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এই পর্যটক ভোলানো পদ্ধতি পাকাপাকি ভাবে চালু করা হয়েছে কিনা তাও জানা যায়নি।
বিষয়টি স্বচক্ষে ক্ষতিয়ে দেখতে আমাদের এক বিশেষ প্রতিনিধি দল  ওই রাস্তায় সাধারণ পর্যটক সেজে যখন যাচ্ছিলেন তখন তারা একবার জাড়োয়াদের দর্শন পেয়েছিলেন, কিন্তু জাড়োয়াদের দেখা পেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই তারা যখন উত্ফুল্য ও একই সাথে আসল-নকল প্রশ্নে দ্বিধা গ্রস্থ তখন বয়স্ক চালককে বলতে শোনা যায় “over acting মানা হ্যায় !”
তবে প্রতিনিধি দলের কারো কারো মতে তিনি বলেছিলেন “over taking মানা হ্যায় !”
তবে তিনি যাই বলে থাকুন, সাম্প্রতিককালে যারা আন্দামান ভ্রমনে গিয়ে জাড়োয়াদের দেখা পেয়ে উত্ফুল্য হয়েছেন বা আগামী দিনে দেখা পেয়ে উত্ফুল্য হবেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি ” নকল হইতে সাবধান !!!”

 

About the author:
Has 214 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RELATED ARTICLES

Back to Top