Tinpahar
No Comments 75 Views

রবীন্দ্রনাথের শেষ কবিতা : একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
Professor, Bengali Department

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী I
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে I
এই প্রবঞ্চনা নিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখনি গোপন রাত্রি I
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে-পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ
সে যে চিরস্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চিরসমুজ্জ্বল I
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,
এই নিয়ে তাহার গৌরব I
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত I
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে I
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভান্ডারে I
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার I

প্রাথমিকভাবে এ কবিতায় আমি দেখতে পাই এক দ্বিধাপন্ন অভিযোক্তা মানুষকে, যে প্রবঞ্চিত হওয়ায় অভিযোগ জানায় I সেই প্রবঞ্চনা থেকে উত্তীর্ণও হয়ে যেতে পারে সে নিজস্ব বোধির আশ্রয়ে I টানা চব্বিশ চরণের প্রথম সাতটি চরণ জুড়ে সেই প্রবঞ্চিত অন্তঃকরণ তীব্র হয় কয়েকটি নেতিবাচক শব্দের যোজনায় I বঞ্চনা, ছলনা, মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ –এরকম কয়েকটি শব্দ I অষ্টম চরণ থেকে যখন জ্যোতিষ্কের দেখা মিলল, তখন থেকে অবশ্য অভিযোক্তার স্বর বদলে গেছে একেবারে I তখন অভিযোগের বহির্মুখী ফলা সংবৃত হয়ে যেন বক্তার বশীভূত হল I শান্ত হল যাবতীয় বাহ্য উত্তেজনা I ধীর প্রশান্তিতে বিনত হতে হতে শেষ তিনটি চরণে ব্যক্ত হল এ কবিতার সারাৎসার I
শুরুর থেকে এ কবিতা চলছিল আমার তালে তালে I অক্ষরবৃত্তের মন্থর লয়ে প্রায় অশ্রুত চাপা নিশ্বাস মিশে যাচ্ছিল I চরণ বিন্যাসের অসম ফাঁকগুলোর মাঝে মাঝে একটু করে বাতাস ভরে নিচ্ছিলাম বুকে I বিরাম চিহ্নে প্রতিহত হয়ে কখনো বা শ্রুতিগ্রাহ্য হয়ে উঠছিল গোপন নিশ্বাস I তারপর চরণের সেই একই ধারণ রইলো, রইলো সেই লয়, তবু আশ্চর্য এক আলোয় মগ্ন হতে থাকলো কবিতাখানি I চিরস্বচ্ছ, আলোকধৌত, সমুজ্জ্বল শব্দের নিষ্কলুষ জ্যোতিতে দীপ্যমান হয়ে উঠলো কবিতার প্রান্তভাগ I অত্যন্ত কাঙ্খিত এই আলোর আবেশের মধ্যে কোনো কোনো চতুরালি নেই I নেই আলো-আঁধারির কুহকি আকর্ষণ I মোক্ষপ্রার্থীর মত এখানে; এই স্নিগ্ধ সাদার মধ্যে শান্ত হয়ে যেতে হয়, মৌন হয়ে যেতে হয় I কথা তো চলে শুধু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বেলা, উপলব্ধিতে যা কিছু অর্জন হয় তার স্থান দেশশুন্য মনের গহনে I
আমি মুগ্ধ এবং মৌন হই সেই নিশ্চঞ্চল গভীরতায়, কিন্তু স্বচ্ছন্দ বোধ করি প্রথমাংশের ঐ নিজস্ব প্রতিবেশে I আমারও তো অভিযোগ ঝিকিয়ে ওঠে মনের মাঝে; বলতে ইচ্ছে করে : ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনাজালে, / হে ছলনাময়ী I / মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে / সরল জীবনে I / এই প্রবঞ্চনা নিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত I ‘
আমি যতটুকু, আমি যেমনতর, ততটুকুর প্রকাশ যখন অসম্ভব ঠেকে; যখন কি যন্ত্রনায় মরি ‘পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে’ — তখনই তো নিজেকে প্রবঞ্চিত মনে হয় I তখনই মনে মনে খাড়া করি এক অভিযুক্ত প্রতিপক্ষ; যে আমার ছন্ন জীবনের টুকরোগুলো গাঁথে I যে সরল জীবনের উপর বিছিয়ে রাখে ‘মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ I’ সরল বিশ্বাস চলকে যায় বারবার I মহৎ বলে যাকে আঁকড়ে ধরি, হয়ত তার মিথ্যে বেরিয়ে পড়ে অচিরেই I আমি উত্তীর্ণ হতে পারি না সেই প্রবঞ্চনা থেকে । ‘শান্তির অক্ষয় অধিকার’ তো আমারও কাম্য, কিন্তু তা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করতে পারি না নিজেকে I ‘শেষ পুরস্কার’ তবে কি অধরাই থেকে যাবে আমার ? সুরম্য জ্যোতিষ্ক কখনই কি উঠবে না আমার আকাশে ?
বুঝতে পারি ঐ ইতিবোধে প্রাণিত অভিযোগ যেভাবে নিজের থেকে নিজেকে ছিন্ন করে নিতে পারে এবং শুদ্ধচ অন্তরঙ্গ পরিচয়ে শেষ পর্যন্ত আস্থিত হতে জানে তেমন আমি নই I বাইরের কুটিলতা এত বেশি আচ্ছন্ন করে রাখে আমাদের, যে, অন্তরের দিকে তাকাবার অবকাশই হয় না I ‘অন্তরে সে ঋজু’ একথা বলতে ভরসাই হয় না তাই I পাছে লোকে ‘বিড়ম্বিত’ বলবে এই ভয়ে আরো একটা বাঘছাল জড়িয়ে নিই গায়ে I এই আমরা I স্তরে স্তরে বিভাজিত আত্মরতিকাতর এই মানুষেরা; — আড়াল খুঁজি শামুকের মত, সরীসৃপের মত কোনো শীতঘুমে I
এইবার, এই এতক্ষণে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাময় ঈর্ষায় তাকিয়ে থাকি এই কবির দিকে I জীবনের প্রতি কি পরম নিয়ন্ত্রণ, কি গভীর আত্মশাসন এই কবির ! আমারও তো আছে আলোর প্রার্থনা I আমার আলো-অন্ধকারের অন্তর্জগৎ উদ্ভাসিত হোক সমুজ্জ্বল আলোয়, দ্বন্দ্বে-ক্ষতে আলোর আশীর্বাদ ঝরে পড়ুক — এ তো আমার চাওয়া I জ্যোতিষ্কের মতো নাই বা হল তার আয়োজন I অথচ আমাদের কবি সাবলীলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যেতে জানেন I জীবনের সংক্রান্তি বিন্দুতে দাঁড়িয়ে এমন নির্বিকল্প উচ্চারণ, এমন স্থিতপ্রজ্ঞা দেখে ওই শ্রদ্ধাময় ঈর্ষা হয় মনে I দ্বন্দ্ব তো তারও ছিল ! তা না হলে অমন বারবার কেন ফিরে আসবে প্রবঞ্চনা, ছলনা শব্দগুলি শেষ পর্বের কাব্য জুড়ে ? সে সব কবিতায় একটিই আকুতি : ‘নিয়ে যাক যত দিনে দিনে জমা করা / প্রবঞ্চনায় ভরা / নিষ্ফলতার সযত্ন উপহার’ [যাবার মুখে, সেঁজুতি] ….আর এরই বিপরীতে —
‘চৈতন্যের শুভ্রজ্যোতি / ভেদ করি কুহেলিকা সত্যের অমৃতরূপ করুক প্রকাশ I’ –‘আরোগ্য’-র এই কবিতা শুরুই হয়েছে ‘আমি’-র আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাওয়ার প্রার্থনা দিয়ে I এই অহং মুক্তির সাধনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অন্যত্র লিখেছেন — ‘আমার জীবনে নিরন্তর ভিতরে ভিতরে একটি সাধনা রাখতে হয়েছে I সে সাধনা হচ্ছে আবরণ-মোচনের সাধনা, নিজেকে দুরে রাখার সাধনা I আমাকে আমি থেকে ছাড়িয়ে নেবার সাধনা I’
আমি-বিমোচনের এই সাধনা তো রবীন্দ্রনাথের আজন্মের সাধনা I শুধু শেষ পর্বেই তো নয়, ‘মানসী’-র ‘জীবন মধ্যাহ্ন’ কবিতাতেও দেখি একই আত্মশাসন I কতই বা বয়স তখন ? বড়জোর উনত্রিশ ! ক্রমে ‘কলরব মুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গনে’ যখন তাঁকে এসে দাঁড়াতে হল, তখন এই সাধনা হয়ত বা আরও জরুরি হয়ে উঠলো কবির কাছে I ‘শেষ সপ্তক’-এর ‘অনেক কালের বুড়োটা’-র থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার একটা আয়োজন তো ছিলই, এখন প্রয়োজন হয়ে পড়ল নিজের ‘নামের প্রতিমা’ থেকে অন্তরঙ্গ শুদ্ধ স্বরূপে মুক্তি পাওয়া I ‘বাহ্যিকতার থেকে আন্তরিকতার’ দিকে নিবেশিত হতে চাইছেন কবি I সজনতার মধ্যে খুঁজতে চাইছেন একটু নির্জনতা I যে জনতা মূর্তি গড়ে, স্ট্যাচু বানায় — সেই জনতাই সরাসরি উদ্দিষ্ট হয় ‘নবজাতক’-এর ‘জন্মদিন’ কবিতায় : ‘তোমরা রচিলে যারে / নানা অলংকারে / তারে তো চিনিনে আমি, / … তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই মোর নামের প্রতিমা / … কেহ এক দেখে তারে, কেহ দেখে আর I / আর মাঝে মাঝে শুন্য, এই নিয়ে পরিচয় গাঁথে / … তোমাদের জনতার খেলা / রচিল যে পুতুলিরে / সে কি লুব্ধ বিরাট ধূলিরে / এড়ায়ে আলোতে নিত্য রবে I / একথা কল্পনা কারো যবে / তখন আমার / আপন গোপন রূপকার / হাসেন কি আঁখি কোণে / সে কথাই আজ ভাবি মনে I’
‘আরোগ্য’-এর এই বহু পঠিত কবিতাটিতেও পুনরাবৃত্ত হয় কথাগুলি : ‘জীবনের জটিল যা বহু নিরর্থক, / মিথ্যার বাহন যাহা সমাজের কৃত্তিম মূল্যেই / তাই নিয়ে কাঙালের অশান্ত জনতা / দূরে ঠেলে দিয়ে / এ জন্মের সত্য অর্থ স্পষ্ট জেনে যাই যেন I’ /
কিংবা –
‘লোকখ্যাতি যাহার বাতাসে / … পড়ে থাক পিছে / বহু আবর্জনা, বহু মিছে’ / [জন্মদিনে, ১২ সংখ্যক] I
লোক বিড়ম্বনা যেন তাঁর যাত্রাকালে না ফেলে তার ছায়া ‘সত্যের ধরিয়া ছদ্মবেশ I’ [জন্মদিনে, ১৩ সংখ্যক] I
এই একটিই ভাব নানাভাবে ব্যক্ত হতে দেখি শেষ পর্বের অনেক কবিতায় I এইসব কবিতাগুলির সঙ্গেই মিলিয়ে আমি পড়ি আমাদের আলোচ্য কবিতাখানি I আর এই পরম্পরিত কাব্য পথে মনে হয়, তাঁর জীবনের শেষ কবিতা ( তোমার সৃষ্টির পথ ) আমার থেকে তাহলে আরও দূরে চলে গেল I আমাদের সংকট আমাদের এলোমেলো অস্তিত্বের সাদা-কালো নিরূপণের বিপন্নতার কারণে I রবীন্দ্রনাথের সংকটের ধরন অন্যতর I তবু যে এ কবিতা আমারও কবিতা হয়ে ওঠে সে ওই সংকটের কথা আছে বলেই I সংকট আর দ্বিধার স্বরূপ যতই ভিন্ন হোক, আমি জানি আমাকে তাতেই আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর রবীন্দ্রনাথ তাকে অনায়াসেই অতিক্রম করে যেতে পারেন I আমিও তো আলোর পিয়াসী I একবুক আলোক-প্রার্থনা নিয়ে এ কবিতার কাছে তাই ফিরে ফিরে আসি I ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে’ কখন হয়ত শেষ সত্যের চরণ আমারও মন্ত্র হয়ে উঠবে ! আমার সংকীর্ণ আকাশ আলোয় আলোয় ভরে দেবেন তখন রবীন্দ্রনাথ !

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top