Tinpahar
No Comments 20 Views

শহুরে শোহ্‌রৎ (১)

১.

সাধ করে, আর অনেক কোশেশ্‌ করে কলামের নাম রেখেছি শহুরে শোহ্‌রৎ। প্রথম শব্দটা বাংলায় ভালোই চলে, পরেরটা অপরিচিত। শোহ্‌রৎ এর মানে খ্যাতি, যশ – এইসব আরকী! এই যে বললাম, পরের শব্দটা বাংলায় চলে না, তার কিছু কারণ আছে। ভাষা বাঁক বদলায়। মানুষের যাতায়াতের পথ ধরে ছুটকো-ছাটকা শব্দ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় এসে বসত গাড়ে। খোঁজ করলে এইসব পথের হদিশ মেলে। শব্দের বাপ-ঠাকুদ্দার সাকিন-ঠিকানা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত হাজারখানেক বছরের হিসেব ঘাঁটলে দেখবো, পুবের পথ ধরে এমন কতো মানুষ এলো গেলো। তাদের পিছুপিছু শব্দরাও কম যায় নি! তবে পশ্চিম এশিয়া থেকে নানা ভাষা আর নানা শব্দ আমাদের উপমহাদেশে আসার পথে কোনটা যে কোন রাস্তায় কতোদূর এসে থমকে গেছে, তার হদিশ মেলা ভার। দ্বিতীয় শব্দটা সেই কিসিমের একখানা নমুনাস্বরূপ এখানে রয়ে গেলো। পরে কাজে লাগবে। এই শব্দটা যেমন, উর্দু তে ভালোই চলে, হিন্দিতেও কেউ কেউ বুঝে নিতে পারেন। বাংলা অব্দি আর এসে পৌঁছয়নি।

ভেবেছিলাম, শহরের গপ্পো বলব। শহরের নাম-যশ-খ্যাতি এইসব নিয়ে কাহিনি ফাঁদবো, আর অবরে-সবরে নিজের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা টুক করে তার মধ্যে গুঁজে দিলেই কার্যসিদ্ধি! তবে উঞ্ছবৃত্তিতেও বুকের পাটা লাগে। ও কাজ সবার দ্বারা হয় না। খোলসা করেই বলছি, সে রাস্তা ছাড়তে হলো। এই কলামে তাই অন্য এক কিসিমের গল্প। মানুষের গল্প, ভাষার গল্প আর মানুষের হাত ধরে ভাষা-সংস্কৃতির চরে বেড়ানোর কাহিনি। তবে শহরের গল্পের মায়া ছাড়তে পারিনি। কারণ এই শহরগুলোয় না পৌঁছলে, শহুরে পথের আঁকেবাঁকে না হারালে, হাট-বাজারের দরদামের মধ্যে না পড়লে, এই একটা গল্পও আমার জিম্মায় এসে পৌঁছতো না। তাই শুরুতে একটুখানি ভ্রমণগাথা; আর তারপরে সেই শহুরে বেড়ানোর পাকদণ্ডি বেয়ে বেয়ে ভাষা আর মানুষের কিস্‌সা।

 

২.

অনেকে হয়তো আগেই জানেন, তা’ও বলি, সংস্কৃত নাটকে সব চরিত্র মান্য সংস্কৃতে কথা বলে না। মহিলারা প্রায় সকলেই শৌরসেনী প্রাকৃতে কথা বলেন। ভৃত্যস্থানীয় লোকজন মাগধী প্রাকৃতে আর গানবাজনা যা হওয়ার, তা অধিকাংশই মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে। তা, এরকম বহু নাটকে শকার বলে একজন type character রয়েছে। এই কথাটার আর বাংলা করলাম না। মোলিয়্যের এর কমেডি বলুন বা আমাদের মাইকেলের প্রহসন – খুঁজলে এরকম বহু type character এর সন্ধান পাওয়া যাবে। চাকর-পুরুত-ফড়ে-দালাল, এইসব রকমফেরে একরকম ছাঁচে ঢালাই করা চরিত্র। তা যা বলছিলাম, অনেক সংস্কৃত নাটকেই ‘শকার’ বলে একজন লোক থাকতো। সে মাগধী প্রাকৃতে কথা বলতো। সোজা বাংলায় এর পরিচয় ফড়ে বা দালাল। তবে অবরেসবরে বজ্জাতি করতেও এর জুড়ি মেলা ভার। তা, এর নাম শকার হলো কেন? কারণ এ বেচারা তিনটে ‘স’ এর মধ্যে কেবল ‘তালব্য শ’ উচ্চারণ করতে পারে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলায় আমরা যতই শ, ষ, স– এই তিনখানা ‘স’ ব্যবহার করি না কেন, উচ্চারণের বেলায় কেবল একটাই। সেটা তালব্য শ। উল্টে, কেউ যদি ‘দন্ত্য স’ ওয়ালা বানান ‘দন্ত্য স’-এর আদলেই উচ্চারণ করেন, বাংলায় তাকে বলে ‘স’ এর দোষ। আর একটু খোঁচা মারলে দেখা যাবে, বাংলা তো আদতে পূর্বমাগধী প্রাকৃত থেকেই এসেছে। তো, আমরা বাঙালিরা শকারের বংশধর হবো না তো কে হবে?

 

এই মওকায় আরেকটা যুক্তি শুনিয়ে রাখি। অনেক পণ্ডিতে বলেন, শকার নিয়ে এতো গালগল্পের অবকাশ নেই। ভারতের উত্তরপশ্চিম সীমান্তে রাজত্ব করা সেকেন্দার শাহ-র বংশধর গ্রিকদের কল্যাণে ভারতীয় নাটকে একটি জিনিষের আমদানি ঘটেছিলো। বিধর্মী অর্থাৎ ‘যবন’ থেকে আসা বলে তার নাম যবনিকা। শকার চরিত্র-ও তেমন এক আমদানি। শক শাসকদের দান। তবে, বেশি ইতিহাসনিষ্ঠ হলে গল্প জমে না। তাই আমাদের গল্পের খাতিরে এই পণ্ডিতি যুক্তির চেয়ে আগের গল্পটা ধরেই বরং এগোনো যাক।

 

শকার আর বাঙালিদের মিল-অমিলের কথা বলছিলাম। কিন্তু খেল সেখানেই খতম হলো না। আমরা একা নই। এতদিনে আরেক শকারের হদিশ পেয়েছি। সেটা নিয়েই এবারের কিস্তি।

 

৩.

বুদাপেস্ত। হাঙ্গেরির রাজধানী। দানিয়ুব নামের এক বিখ্যাত নদীর কথা পড়েছি ভূগোলে। তার ধারে ধারে চার-চারটে দেশের রাজধানী। তাছাড়া, মোট দশখানা ইয়োরোপীয় দেশের গা বেয়ে চলেছে সে নদী। এমন এক নদীর দুই পাড় জুড়ে বুদাপেস্ত শহর। একপাশে বুদা, নদীর অন্য পাড়ে পেস্ত। দু’য়ে মিলে বুদাপেস্ত। আগে দু’টো আলাদা শহর ছিলো। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি এ দু’টোকে জুড়ে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়। ১৮৪৯ এ একখানা সেতু গড়ে ওঠে। তার ইংরিজি নাম ‘Chain Bridge’;  হাঙ্গেরীয় তে বলে Széchenyi lánchíd. দানিয়ুবের ওপর এটাই প্রথম স্থায়ী সেতু। তারপর ধীরে ধীরে দু’টো আলাদা শহর একসাথে মিশে যেতে থাকে। ১৮৬৭ তে আরেকটা গুরুতর ঘটনা ঘটে। অষ্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির বোঝাপড়ায় নতুন কলেবরে জন্ম নেয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য। তার বছর কয়েক পরেই সরকারিভাবে দানিয়ুবের দুই তীরের দুই শহরকে একসাথে মিলিয়ে দেবার ঘোষণা করা হয়। ১৭ নভেম্বর ১৮৭৩ থেকে বুদা আর পেস্ত এর মধ্যে আর কোনও হাইফেনের প্রয়োজন রইলো না। তারপর থেকে, একটাই আস্ত শহর, বুদাপেস্ত।

 

আমি এতদিন জানতাম, নামটা বুদাপেস্ত। তবে সেখানে পৌঁছে ইস্তক ট্রেনে, বাসে, পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমে – সর্বত্র সবাই বলছে বুদাপেশ্‌ৎ। পোস্টাপিসে পৌঁছে দেখি, পোস্ট কে বলে পোশ্‌তা। সর্বত্র তালব্য শ এর ছড়াছড়ি। বাঙালি ছাড়াও আরেক প্রকার শকার পাওয়া গেলো দেখে যারপরনাই আহ্লাদ হলো। সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি হয় বলে শুনেছি। শকারে-শকারে কী হতে পারে? শ-কার ব-কার করতে পারার মতো ইয়ারদোস্তি কি? অতটা না হলেও, বুদাপেশ্‌ৎ-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। বুদাপেশ্‌ৎ-এর নামে এই তালব্য শ এর ব্যাপারটা কেন আগে খেয়াল করিনি, তা ভেবে অবাক হচ্ছি। সুনীতিবাবু সেই কবে এই বানানটাই লিখে গেছিলেন, হাঙ্গেরীয় ভাষার তালব্যধ্বনি-প্রীতির কথা অনেক যুক্তি সহকারে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে। সে লেখা হাতে পড়লো বুদাপেশ্‌ৎ থেকে ফিরে আসার পর। ওঁর পশ্চিমের যাত্রী বলে একটা বইয়ে ১৯৩৫ সনে মধ্য ইয়োরোপ ঘুরে-বেড়ানোর অনেক কীর্তিকাহিনি ছাপা আছে। তাতে উনি লিখছেন, “ছয়টা রা’ত বুদা-পেশ্‌ৎ এ কাটাই। মুক্তকন্ঠে ব’লবো, এমন সুন্দর শহর আমি আর দেখিনি”। আর দু-দশটা বিষয়ে না হোক, বেড়ানোর ক্ষেত্রে, আর বেড়ানোর গল্প বলার ক্ষেত্রে অনেকদিন যাবৎ সুনীতিবাবুকে গুরুঠাকুর মেনেছি। তাই, আমিও মুক্তকন্ঠে স্বীকার করি, এমন সুন্দর শহর আমি আর দেখিনি। তবে, জাঁকজমক, চেকনাই, বড় বড় ইমারৎ – এইসব ভেবে সৌন্দর্যের কথাটা পাড়ি নি। সেটার অন্য কারণ আছে। ধীরে ধীরে বলছি।

 

সুনীতিবাবু লিখেছেন, “আবার কবে আসবো’, এই মনোভাব নিয়ে, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নগরীশ্রেষ্ঠ বুদা-পেশ্‌ৎ এর কাছ থেকে বিদায় নিলুম”। এ প্রসঙ্গে মনে পড়লো, ত্রেভির ফোয়ারায় পয়সা ফেললে নাকি রোম শহরে আবার ফিরে আসা নিশ্চিত করা যায়। এ যাত্রায় রোম-এ সব কিছু দেখা হয়নি বলে শেষদিনে পড়ি-কী-মরি করে ত্রেভি তে গিয়ে পয়সা ফেলে এসেছি। বুদাপেশ্‌ৎ এ ফিরে আসার এমন কোনও ফিকির রয়েছে বলে জানা নেই। না হলে সেটা করতে কোনও দ্বিধা ছিলো না।

 

৪.

প্রথম দর্শন। বুদাপেশ্‌ৎ-এর কেলেটি রেলস্টেশন। ১৮৮৪ সনে গড়া। তখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত রবরবা! তা বলে, স্টেশন-বাড়ি ও কেউ এভাবে বানায়? ভেবে অবাক হই। বিশাল ইমারৎ। তার সামনের দেয়ালে জেমস ওয়াট আর জর্জ স্টিভেনসন এর মূর্তি। যাঁদের কল্যাণে রেলগাড়ি চলছে, তাঁদের মূর্তি বসিয়েছে। সে, ভালো কথা। কিন্তু পাগল-ছাগল না হলে কেউ স্টেশন-বাড়ির ভেতরের দেয়াল জুড়ে ফ্রেস্কো আঁকায়? খোঁজ নিয়ে জানলাম, কার্ল আন্তোন পাউল লোৎস বলে এক চিত্রকর অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের এক্কেবারে শেষপর্বে বেশ নাম করেন। রাজা-উজিরদের বাড়িঘরদোর, আপিস, মিউজিয়াম – এসবের ছাদ আর দেয়ালে ফ্রেস্কো এঁকে অনেক নামযশ হয়। তা, স্টেশনবাড়িই বা বাদ পড়ে কেন? তাই স্টেশনে ঢুকতেই মেইন হল-এ, টিকিটঘরে – সর্বত্র এরকম দেয়ালজোড়া ফ্রেস্কোর ছড়াছড়ি। এ প্রসঙ্গে বলি, ইস্তানবুল দেখে মনে হয়েছিলো, একটু আগ্রা, একটু ঢাকা আর বাদবাকি হায়দ্রাবাদ এক জায়গায় ঠেসে পুরে দেওয়া হয়েছে। তেমনই বুদাপেশ্‌ৎ-এর রেলস্টেশন দেখে মনে হয়, আধখানা বোম্বাই ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস, সিকিভাগ লখনৌ চারবাগ আর বাকিটা আশির দশকের হাওড়া স্টেশন! এ’সব কথা এমনি এমনি বলছি না। পশ্চিম আর মধ্য ইয়োরোপের রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে এই প্রথম একখানা রেলস্টেশন দেখলাম, যেটাকে ঝকমকে আর আধুনিক করার নামে কুৎসিত-দর্শণ শপিং আর্কেড বানিয়ে ফেলেনি। এমন রেলস্টেশন-ও তাহলে রয়েছে, যেখানে ম্যাকডোনাল্ডস এর একঘেঁয়ে ছাঁচে ঢালা দোকান দৃষ্টি আটকে বসেনি। তার বদলে ছোটখাটো ঠ্যালাগাড়ি ফল-মিষ্টি-পাউরুটি-কেক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাওড়া স্টেশনের হুইলারের মতো কাঠের দোকানে হরেকরকম সস্তার বই আর পত্রপত্রিকা। এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। মেঝেতে ফরাস পেতে খবরের কাগজওয়ালা তাঁর পশরা সাজিয়ে ঝিমোচ্ছেন; আর স্টেশনবাড়ির দেয়ালে দড়ি টাঙিয়ে তাতে ক্লিপ দিয়ে অনেক চটি বই ঝুলিয়ে রাখা আছে। সস্তার কাগজে দু’রঙা-তিনরঙা মলাট। তার মধ্যেও যেগুলো আরও একটু সরেস, সেগুলো আড়ালে-আবডালে রাখা। রসিকজনে অবশ্য তার হদিশ জানেন, সেটা আন্দাজ করতে পারলাম। খরিদ্দারি-ও চলছে ঢিমে তালে।

 

আমাদের ছোটবেলায় দূরদর্শনে একটা অনুষ্ঠান হতো। তার নাম হরেকরকমবা। শুরু থেকেই দেখছি, বুদাপেশ্‌ৎ এমন হরেকরকমবা-র দেশ। যা দেখি, তা’ই আশ্চর্যের অভিজ্ঞান। টিকিটঘরে ফ্রেস্কো আঁকানোর কথা তো বলেছি। কাছে গিয়ে দেখি, আরো মজা। সুন্দর ডিজাইন করা কাঠের জানলাওয়ালা টিকিট কাউন্টার। তাতে আবার কোনও ইলেকট্রনিক কারসাজি নেই। এদিক-সেদিকে হাতে লেখা বা ছাপানো নোটিশ দেয়ালে লটকে রেখেছে। পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমে যে শব্দ ভেসে আসছে, সেটার গড়নও অন্যরকম। পুরো আবহ-টা দেখেশুনে মনে হলো, আশির দশকের হাওড়া স্টেশনে এনে ফেলেছে! কিম্বা, যেন বিবিসি-র মাইকেল পলিনের ডকুমেন্টারি থেকে উঠে আসা আশির দশকের সোভিয়েত দেশ বা পূর্ব ইয়োরোপ! স্টেশনের বাইরে দেখি, সাবেক সোভিয়েতের তাঁবে থাকা অনেক দেশের পথঘাটের যেমন ছবি দেখেছি, কতোকটা সে’রকম দৃশ্য। সে’সব দেশের পুরোনো ছবিতে যেমন ট্রামের টিকির আদলে দু’টিকিওয়ালা বাসের ছবি নজরে আসে, তেমন বাস সশরীরে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে। ট্রামও আছে। হলদে রঙের। সে ট্রামলাইন স্টেশন চত্বর ছেড়ে দানিয়ুবের পাড়ের দিকে পাড়ি দিচ্ছে। আমি ভাবি, রং, দৃশ্য – এ’সব না’হয় অচেনা ঠেকতে পারে। শব্দের গড়ন এরকম অদ্ভুত হলো কী করে? গত তিরিশ-চল্লিশ বছরে এঁরা হয়তো পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমের প্রযুক্তি বদলায়নি, বা হয়তো ভাষার গড়নটাই অন্য। সরাসরি এর উত্তর পাইনি। একটু ঘুরপথে মালুম হলো।

 

৫.

স্টেশনের আরেকপাশে পোস্টাপিস, পোশ্‌তা। কয়েকটা চিঠি ডাকে ফেলার ছিলো। তাই ডাকটিকিট কিনতে পোশতায় যাওয়া দরকার। গেলাম। সেখানে আরেক গেরো। ভাষা বুঝিনা। আর সে সমস্যা যে সহজে মিটবে, এমন আশা নেই। তাহলে, এ প্রসঙ্গে হাঙ্গেরীয় ভাষার ঠিকুজি-কুলুজি আরেকটু খোলসা করে বলি। ইয়োরোপের মুল ভূখণ্ডে তিনখানা ভাষা অবশিষ্ট রয়েছে, যারা কিনা ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে আসেনি। হাঙ্গেরীয়, ফিনিশ আর এস্তোনীয়। এই জাতীয় আরও কয়েকটা ভাষা রাশিয়ার উরাল পর্বতের আশেপাশের কিছু ছোটখাটো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেঁচেবর্তে রয়েছে। তবে তারা খুব শিগ্‌গিরি বিলুপ্তির পথে। যাই হোক, এই হাঙ্গেরীয়-র অবস্থানটা খুব গোলমেলে। আশেপাশে যেদিকে দু’চোখ যায়, সর্বত্র ইন্দো-ইয়োরোপীয়। একদিকে জার্মানিক, অন্যদিকে স্লাভিক, আর আরেকদিকে রোমানিয়ায় ল্যাটিনিক। এ’রকম একটা বদ্ধ জায়গায় হাজার বছর ধরে ভাষাটা যে রমরম করে বেঁচেবর্তে রয়েছে, সেটাই একটা বিস্ময়ের ব্যাপার! কিন্তু আমার মতো লোকের পক্ষে এর বিপদটা অন্যত্র। সম্পূর্ণ অন্য এক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা বলে হাঙ্গেরিতে আমার জানা তিন প্রধান পশ্চিম ইয়োরোপীয় ভাষার শব্দ আন্দাজে ছুঁড়ে দিয়ে common পাবার সম্ভাবনা কম।

 

পোশ্‌তায় গিয়ে ফাঁপরে পড়লাম। এদের পোস্টাপিস আমাদের মতো। ডাক চালাচালির কাজের তুলনায় স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্প আর অন্যান্য আমানতের কাজকম্মোই বেশি। লাইনে অধিকাংশই বুড়োবুড়ি। আমি তো প্রথমে ঠাহর করতে পারিনি, যে তাঁরা সকলেই টাকা তোলার লাইনে দাঁড়িয়েছেন! আর আগেই বলেছি, পুরোপুরি বিজাতীয় ভাষা। চার-পাঁচটা ইংরেজি-ফরাসি-জার্মান শব্দ আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার আদলে ব্যবহার করে দেখলাম, কোনও লাভ নেই। ফলে, শেষ ভরসা হাত-পা নেড়ে অনেক কষ্টস্বীকার করে, শেষমেশ জানতে পারলাম, ডাকটিকিট বিক্রির জায়গাটা আদতে কোথায়। অতঃপর আরেকপ্রস্থ হাত-পা নেড়ে আকারে-ইঙ্গিতে কথা চালাচালি। ডাককর্মী কাগজে লিখে দেখালেন, কতো দাম দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বেশ লজ্জায় পড়তে হয়। যে দেশে গিয়ে পৌঁছেছি, নিদেনপক্ষে সেখানকার ভাষার সংখ্যাবাচক শব্দগুলো জানলেও অনেক কাজে দিতো! বিপুলা এ পৃথিবীর এতো কম জানি, যে লজ্জায় পড়া ছাড়া অন্য কোনও উপায়-ও বোধহয় নেই!

 

৬.

বুদাপেশ্‌ৎ শহরে পথঘাট-হাটবাজার-অট্টালিকা, কোনওটারই কোনও অভাব নেই। একখানা সুন্দর পার্লামেন্ট রয়েছে। টিকিট কেটে তার ভিতরে ঢুকে দেখে এসেছি। একটা কেল্লা আছে, সেখান থেকে রাত্তিরবেলা দানিয়ুব নদী আর তার ওপরে আলো-ঝলমলে ব্রিজগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগে। কয়েকটা গথিক গির্জা রয়েছে, আর কয়েকটা বারোক্‌। সোজা হিসেবে, আর পাঁচটা এই মাপের শহরে আর যা যা থাকা উচিত বলে মনে হয়, তার সবই আছে। তা’হলে আর নতুন কথা কী? আছে, আছে, নতুন অনেক কিছুই আছে। তাই ল্যাজা-মুড়ো সহযোগে বেশ গুছিয়েই বলছি। শুরুতেই বলেছি, নির্ভেজাল ভ্রমণকাহিনি লেখার মুরোদ নেই। তাই গল্পের খাতিরে পার্লামেন্ট, কেল্লা আর গির্জাগুলোর বর্ণনা বাদ দিলাম। অন্য একটা জায়গার কথা বলি। এমন জায়গা পশ্চিম ইয়োরোপে সচরাচর চোখে পড়ে না। সেটার ইংরিজি নাম Great Market Hall , আর হাঙ্গেরীয় তে বলে Nagycsarnok।

 

আমাদের চুঁচড়োর স্টেশনবাজারে পটল সরকারের মিষ্টির দোকান। আমার বাবার বয়সীদের পটলদা, আমাদের পটলজ্যেঠু। ছোট্ট দোকান, কিন্তু সারাদিন ভিড় উপচে পড়ছে। মিষ্টি বেচে যা লাভ হয়, তাতে আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয় (অর্থাৎ যাদের কিনা কোনও শাখা-প্রশাখা নেই) হয়ে থাকার কোনও মানে ছিলো না। তবে পটলজ্যেঠুরা তিন ভাই বেশ দার্শনিক প্রজাতির মানুষ। রাত সাড়ে সাতটা-আটটা বাজতেই দোকানের ঝাঁপ নেমে যায়। ওঁদের কথায়, রাত দশটা অব্দি দোকান খোলা রাখলেও খদ্দেরের ভিড় লেগে থাকবে। এই লাভেই দিব্যি চলে যাচ্ছে। উটকো হ্যাঙ্গাম বাড়িয়ে লাভ কী? পাশে অন্য দোকানের অভাব নেই। তাতে চমক বেশি, চেকনাই জেয়াদা। কিন্তু খদ্দেরের দেখা নেই! মাছি তাড়ানোই সার। পটল সরকারের উল্টোদিকে শিবুর সবজির দোকান। এক কাহিনি। সব লোকজনের নজর ঐ দিকে। পাশে যে আরও পাঁচ-দশজন পশরা নিয়ে বসে আছে, সেদিকে কারোর খেয়াল নেই। বুদাপেশ্‌ৎ-এর মার্কেটহল আমাদের চুঁচড়োর স্টেশনবাজারের দোসর। একখানা বিশাল পাথুরে অট্টালিকা। তার ভেতরে দু’-তিনতলা জুড়ে বাজার। এ’ও সেই অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের পড়ন্তবেলার কীর্তি। ১৮৯৭ সন নাগাদ গড়া হয়। তবে আমার ভালো লাগার ক্ষেত্রে এ’সব কেজো কথার ভূমিকা কম। ওখানে ঢালাও আলু-পেঁয়াজ-সবজিপাতি বিক্রি হচ্ছে। সামনে সবকিছু ঢেলে রাখা আছে, আর দোকানদার ওজন করে বিক্রি করছে। ডিমের দোকানে শুধুই ডিম, মাছ–মাংসের দোকানে টাটকা পশরার গন্ধ! পুরো এলাকাটায় টাটকা সবজির গন্ধ ম ম করছে। পশ্চিম ইয়োরোপে বেশ কয়েকদিন থাকলে সুপারমার্কেট কালচারে যাঁদের চোখ স’য়ে যায়, তাঁদের জন্য এটা একটা আশ্চর্য মুক্তাঙ্গন! রসুন আর শুকনো লঙ্কার প্রতি আবার হাঙ্গেরীয়দের একটু বিশেষ ঝোঁক। তাই দোকানে লেবু-লঙ্কা ঝোলানোর আদলে সারি সারি রসুন আর শুকনো লঙ্কার মালা ঝুলিয়ে রেখেছে। তবে অপদেবতা তুষ্টি বা নজর-লাগা এড়াতে নয়। নির্ভেজাল বিক্রির অভিপ্রায়ে। তবে হ্যাঁ, চুঁচড়োর কথা বলছিলাম, তা’ও আছে। ছোট্ট ঘুপচি দোকানের সামনে ভিড় উপচে পড়ছে। পাশে আরেকটা দোকান চেকনাই সহকারে হাঁ করে বসে আছে। সেদিকে কেউ যাচ্ছে না। এতো মিল, ভাবা যায় না।

 

মাছের কানকো উল্টে, দরদাম করে কেনার সুযোগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে লোকজন যে দেখেশুনে ওজন করে টাটকা জিনিষ কিনতে পারছে, সেটা দেখে অসামান্য ভাল লাগলো। মোট কথা, একটা সুস্থ আর সভ্য সমাজে মানুষ নামের জীবের ঠিক যেভাবে বাঁচা উচিত, সেভাবে বাঁচতে পারছে! এই বিশ্বব্যাপী সুপারমার্কেটের জমানাতেও মধ্য ইয়োরোপের কোনও রাজধানী শহরে প্যাক করা সাতবাসি জিনিষের বদলে এ’রকম বাজারের রমরম করা উপস্থিতি দেখে সুনীতিবাবুর স্টাইলে আবার বলতে ইচ্ছে হলো, “মুক্তকন্ঠে ব’লবো, এমন সুন্দর শহর আমি আর দেখিনি”।

 

তবে কেবল মাছ–মাংস আর সবজি তে থেমে থাকলে তো আর চলবে না। হাটবাজার জিনিষটা যে কেবল ব্যবসা আর ধান্দাবাজির জায়গা নয়, সামাজিক জনপরিসরে এটার যে অন্য গুরুত্বও থাকতে পারে, বুদাপেশ্‌ৎ সেটা মনে করালো। অন্যান্য দোকানের মাঝে চা-কফির দোকান। লাংগোশ্‌ বলে একপ্রকার তেল-চুপচুপে তেলেভাজা হাঙ্গেরীয়দের খুব প্রিয়। সেটারও গুটিকয় দোকান রয়েছে। টাটকা কেক-পেস্ট্রি-প্যাটিসের দোকান আছে বেশ কয়েকটা। সেখানেও এক জিনিষ! কোনওটার সামনে ভিড় উপচে পড়ছে, অন্যটায় মাছি তাড়ানোই সার। দক্ষিণ ইয়োরোপের কয়েকটা বলকান দেশে ‘ক্রেমশ্নিতা’ বলে একপ্রকার জব্বর পেস্ট্রি পাওয়া যায়। উপরে-নিচে মুচমুচে খাজার মতো দুটো স্তর, আর মাঝে নানা স্বাদের টাটকা ক্রিম নানা স্তরে পর পর সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুদাপেশ্‌ৎ-এর মার্কেটহল-এ সেইপ্রকার একটি জিনিষের সাথে আবার আলাপ হলো। এখানে সেটার নাম ‘ক্রেমেশ্‌’। স্বাদ এবং গন্ধ, কোনওটাই বলকান দেশের সাথে তুলনীয় নয়। তবে চলে যায়। ভিড়ে ঠাসা এমন এক দোকানের সামনে রাখা টুলে বসে ক্রেমশী-র সদব্যবহার করছি, এমন সময় বাজার করতে এসে চায়ের দোকানে আড্ডা জমানো স্থানীয় কিছু প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ার সাথে আলাপ। তাঁরা চা খাওয়ার আনুষঙ্গিক কর্তব্য হিসেবে দার্জিলিঙের নাম জানেন দেখে খুব আহ্লাদ হলো। ওঁদের মধ্যে একজন ইংরিজিতে বেশ কইয়েবলিয়ে। তাঁর মধ্যস্থতাতে কথাবার্তা এগোচ্ছিলো। তাঁর ইতিহাসটাও বেশ মজার। ভদ্রলোক জাতিতে হাঙ্গেরীয়, ভাষাও তাই, তবে রোমানিয়ার নাগরিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খেসারত হিসেবে হাঙ্গেরির দশ আনা জমি অন্যান্য কয়েকটা দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। হাঙ্গেরীয়-ভাষী লোকজন তাই অনেকেই অন্যান্য অনেক দেশে আটকা পড়ে আছেন। তাঁর নিজের এলাকার কথা বলছিলেন। ট্রানসিলভেনিয়ার একটা ছোট গ্রাম। সেখানকার ৯০ শতাংশ লোক হাঙ্গেরীয়। কিন্তু জায়গাটা রোমানিয়ার সীমানার মধ্যে। উনি খেদ করে বলছিলেন, ইয়োরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসের গপ্পো। গত একশো বছরে তাঁদের এলাকাটা পালা করে চারখানা আলাদা সার্বভৌম দেশের সরহদ্দে এসে পড়েছে। এখন রোমানিয়া। তাঁদের জোর করে ইশকুল-কলেজে রোমানীয় শিখতে হয়েছে। কিন্তু উনি তাতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন। আগেই বলেছি, হাঙ্গেরীয় সম্পূর্ণ অন্য এক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা। সেখান থেকে ইন্দো-ইয়োরোপীয়য় অবাধ গতায়াত-টা একটু সমস্যার তো বটেই। আজকাল ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের যুগে সীমানা পার হয়ে এসে থাকাটা সহজ হয়েছে। তাই নিজের ভাষা বলতে পারার সুখে, আর এক ভাষাভাষী লোকজনের কাছাকাছি থাকার তাগিদে বুদাপেশ্‌ৎ-এ এসে বসত করছেন। ওঁর মুখে ওঁর এলাকার আরেক হাঙ্গেরীয়-র প্রসঙ্গে জানলাম। সে দু’শো বছর আগের কথা। তখন এমন হাঙ্গেরি ও ছিলো না। বুদাপেশ্‌ৎ এর এই বাজার ও ছিলো না। কিন্তু ট্রানসিলভেনিয়ার এক ছোট গ্রামের ইশকুলে পড়া এক গরিব ছাত্র হাঙ্গেরীয় ভাষার এমন দ্বীপসুলভ অবস্থিতি আর সে ভাষার উৎপত্তির কারণ খুঁজতে মহাদেশ পেরিয়ে তিব্বত অবধি পাড়ি দেওয়ার প্ল্যান করেন। মাঝে পাকেচক্রে কলকাতা শহরে দু’দশক কাটান। তারপর আবার লাসা যাবেন বলে বেরিয়ে পথিমধ্যে দার্জিলিঙে গত হন। তাঁর নাম Sándor Kőrösi Csoma (বহু কিছুই বাংলায় উচ্চারণ করা যায় না; এটাও সেরকম একটা ব্যাপার। তাই আমি রোমান হরফেই রেখে দিলাম)। আমার শেষ কিস্‌সা এই মানুষটির পথ চলার কাহিনি নিয়ে।

 

৭.

Sándor Kőrösi Csoma-র জন্ম ১৭৮৪ সনে, ট্রানসিলভেনিয়ার এক গ্রামে। বাড়িতে অভাব। বেশ কষ্টেশিষ্টে ইশকুলের গন্ডি পার হয়ে জলপানির সহায়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হ’ন। কিন্তু ইশকুলে থাকতেই একপ্রকার ইচ্ছে চাগাড় দেয়। সেটা অবশ্য সে যুগের অনেক হাঙ্গেরীয়রই মনের ইচ্ছে। পূর্বপুরুষদের আদি ভিটের সন্ধান করতে চাওয়া। আগেই বলেছি, হাঙ্গেরীয় ভাষা চারপাশের অন্যান্য ইয়োরোপীয় ভাষার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। নিকটতম জ্ঞাতি বলতে তুর্কিভাষা। তাছাড়া ততদিনে অনেকে হদিশ দিয়েছেন, অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হলেও হাঙ্গেরীয়রা আদতে হুণ-দের বংশধর। তাই সে যুগে Kőrösi Csoma-র মতো অনেকেরই ধারণা হয়, মোঙ্গল-মাঞ্চু-চিন–তিব্বত, এরকম কোনও একটা জায়গায় গেলে পূর্বপুরুষদের ভিটের খোঁজ পাওয়া যাবে, আর সমগোত্রীয় জাতির মানুষজনের সাথে মোলাকাত হবে। ইচ্ছে তো অনেকেরই হয়। সবার সাহসে কুলোয় না। Kőrösi Csoma সেই অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করে দেখেন।

 

প্রাথমিকভাবে কয়েকটি প্রাচ্যভাষা শেখা প্রয়োজন। তাই জলপানির টাকায় জার্মানির গ্যয়টিংগেন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। সেখানে তখন হানোভারের রাজার দানধ্যানের কল্যাণে প্রত্নভারততত্ত্বের (Indology) এক সেন্টার বেশ জোরকদমে ভারতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। Kőrösi Csoma সেখানে এসে কিছুদিনের জন্য ঘাঁটি গাড়লেন। পাশ করে ১৮১৮ তে কিছুদিনের জন্য নিজের ছোটবেলার ইশকুলে ফিরে যান। সেখানে মাস্টারির চাকরি জোটে। কিন্তু বেরিয়ে পড়ার অদম্য ইচ্ছে। তাই সে চাকরিতে জবাব দিয়ে দক্ষিন হাঙ্গেরিতে এসে কিছু স্লাভিক ভাষা শেখার চেষ্টা। ওঁর ধারণা হয়েছিলো, রাশিয়া হয়ে তিব্বতে পাড়ি দেবেন। তাই রুশ আর অন্য কিছু স্লাভিক ভাষা শেখার বাসনা।

 

এর পরের গল্প রহস্য-উপন্যাসকেও হার মানায়। গাড়িঘোড়ার বালাই নেই। হাতে লাঠি, পিঠে বোঁচকা, উনি একা। হেঁটে চলেছেন। কোনও পাসপোর্ট নেই। মাঝে মাঝে কোনও কোনও দেশে ব্যবসায়ীদের ক্যারাভানে ভিড়ে গিয়ে তাদের মতো স্বল্প মেয়াদের কিছু সার্টিফিকেট জোগাড় করে গ্রিস অবধি আসেন। তারপর জাহাজে করে মিশর, সেখান থেকে সিরিয়া। উত্তর ইরাকের মোসুল বলে এক জায়গায় এসে সেখান থেকে তাইগ্রিস নদী বেয়ে বাগদাদ। সেখানে আর্মেনীয় বণিকদের ছদ্মবেশ ধরেন। সেই পোশাকে তেহরান আসতে সুবিধে হয়। এখান থেকেই সরাসরি মধ্য এশিয়া হয়ে তিব্বত যাবার কথা ছিলো। কী একটা যুদ্ধ হচ্ছে সেই গুজব শুনে পথ বদলে আফগানিস্তান আর ভারত হয়ে পশ্চিম দিক দিয়ে তিব্বতে ঢোকার প্ল্যান করেন। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে রাজা রঞ্জিৎ সিং-এর সেনাদলের দুই ফরাসি অফিসার তাঁকে দেখে ইয়োরোপীয় বলে চিনতে পারেন। এ দুই বান্দা নাকি আগে নাপোলেয়নের সেনাদলে ছিলো। তারপর ভাগ্যের ফেরে রঞ্জিৎ সিং-এর রাজত্বে এসে তাঁর সেনাদলকে ট্রেনিং দিচ্ছিলো, যাতে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়। Kőrösi Csoma সেখানে কিছুকাল চাকরি করেন, টুকটাক পয়সা জমান। সেই পুঁজি সম্বল করে কাশ্মীর উপত্যকা পেরিয়ে লেহ্‌ শহর অব্দি পৌঁছোন। তিব্বত আর যাওয়া হয়নি। পয়সা ফুরিয়ে গেছিলো। তাই আবার কাশ্মীর উপত্যকায় ফিরে আসা।

 

সেখানে মূরক্রফ্‌ট বলে এক ব্রিটিশ সাহেবের সাথে মোলাকাত হয়। রতনে রতন চিনতে বেশি দেরি হবার কথা নয়। সাহেব দেখেন, এ ছোকরার এলেম আছে। এ আগে থাকতেই অনেকগুলো প্রাচ্যভাষা জেনে বসে আছে। এঁকে দিয়ে তাই গুপ্তচরবৃত্তি করালে মন্দ হবে না। সাহেব প্রস্তাব দেন, ব্রিটিশ সরকার ভাতা দেবে। Kőrösi Csoma আবার লাদাখে ফিরে গিয়ে তিব্বতি ভাষার ব্যাকরণ আর অভিধান লিখতে রাজি কিনা? Kőrösi Csoma-ও দেখেন এ তো সুবর্ণ সুযোগ! তিব্বতি শিখতে পারলে তো হাঙ্গেরীয় ভাষার উৎপত্তির খোঁজ করতেও সুবিধে হবে। এর পরের কয়েকবছর আসলে ভাষা, মানুষ, গুপ্তচরবৃত্তির রাজনীতি, অভাব-অনটন – সব মিলে একটি একলা মানুষের ইচ্ছেপূরণের চেষ্টার এক অত্যাশ্চর্য কাহিনি। পুরো কাজটার জন্য ব্রিটিশ সরকার ওঁকে ৫০ টাকা দেবে, এই কড়ারে চুক্তি হয়। সে যুগের হিসেবেও টাকার অঙ্কটা খুব কম। তাই না খেয়ে, না দেয়ে এক লামার অধীনে পড়াশুনো করে, কয়েক বছর ধরে প্রায় ৪০,০০০ তিব্বতি শব্দওয়ালা অভিধানের খসড়া তৈরি করে যেই আবার ব্রিটিশ ভারতের সীমানা পেরিয়ে সমতলে নামতে গেছেন, আবার এক গেরো। আগের সাহেব তখন আর নেই। ওখানকার নতুন সাহেব ভাবলেন, এ নিশ্চয়ই তিব্বতি স্পাই। পুরো উলটপুরাণ। লাদাখ গেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের স্পাই হয়ে, ফেরার পথে তিব্বতি গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ হওয়ায় সোজা ব্রিটিশ সরকারের শ্রীঘরে।

 

ছাড়া পেয়ে আবার একবার লাদাখ ফিরে যান। আরেকপ্রস্থ পড়াশুনো। বহুবার ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া। নতুন নতুন সরকারি কর্তাব্যক্তিদের খেয়াল অনুযায়ী বারবার পুরো প্রকল্পটাই বানচাল হতে বসা। শেষমেশ অনেক রোমহর্ষক ঘটনার অবসানে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি ওঁকে কলকাতায় এসে ওঁর সাধের ব্যাকরণ আর অভিধানের প্রেস-কপি তৈরির আমন্ত্রণ জানায়। ১৮৩৪ এ কলকাতাতেই ছাপা হয়ে প্রকাশিত হয় প্রথম মান্য তিব্বতি ব্যাকরণ আর প্রথম তিব্বতি-ইংরেজি অভিধান। সংকলক Sándor Kőrösi Csoma। ওঁর শখ হয়, ভারতেই যখন আছেন, ক’টি ভারতীয় ভাষা শিখে নিলে মন্দ কী! ফারসি-টা আগেই জানতেন; পরের দু’বছর উত্তর ভারতের অনেক জায়গা ঘুরে-ফিরে হিন্দুস্তানি ও আরো কয়েকটা ভাষা আয়ত্ত করেন। যেসব লেখা পড়ে এই Kőrösi Csoma-র সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি, সেখানে কোথাও লেখেনি বটে, তবে আমার দৃঢ় ধারণা, এতোদিন যখন কলকাতায় থেকেছেন, বাংলা-টাও নিশ্চয়ই গড়গড় করে বলতে শিখে গেছিলেন!

 

অনেক কিছুই তো হলো। তবে ভবি এতো সহজে ভোলে না। এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরিয়ানের পদে কাজ করছিলেন। কিন্তু সে সুখ সহ্য হলো না। পুরোনো শখ চাগাড় দিয়ে উঠলো। লাসা হয়ে আরও উত্তরে যাবেন, আর হাঙ্গেরীয়দের পূর্বপুরুষদের খোঁজ চালাবেন। তাই ১৮৪২-এ আবার একবার চাকরিতে ইস্তফা। আবার একবার পথের টানে বেরিয়ে পড়া। এবার ঠিক করেছিলেন, দার্জিলিং হয়ে তিব্বত সীমান্ত পেরিয়ে লাসা যাবেন। তবে আগের মতো বয়েস তো আর নেই, কয়েক দশক পেরিয়ে গেছে। তরাই পেরোতে গিয়ে ওঁর ম্যালেরিয়া হয়। তারপর দার্জিলিং পৌঁছে এমন এক গল্পের মতো জীবনের ইতি।

 

সুনীতিবাবু লিখেছেন, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে নাকি হাঙ্গেরির বিজ্ঞান ও সাহিত্য পরিষদ থেকে Kőrösi Csoma-র একখানা মূর্তি পাঠানো হয়। ভদ্রলোক অনেকগুলো বছর কলকাতায় থেকে কয়েকটা ভারতীয় ভাষা আর তিব্বতি ভাষার জন্য এতোকিছু করলেন, একবার অন্তত ওঁর নামটা বাংলায় না লিখলে ঘোরতর অন্যায়! তাই শেষবেলায় রোমান এর সাথে বাংলা হরফেও সেটা একবার লেখা উচিত। সুনীতিবাবু ওঁর নামের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ করেছিলেন, ‘শান্দোর চোমা ক্যোর‍্যোশি’। যাই হোক, একটা কাজ বাড়লো। এতোটা যখন জানা গেলো, পরেরবার দার্জিলিং গেলে অবশ্যই এই ক্যোর‍্যোশি চোমা মশায়ের সমাধির খোঁজ করতে হবে। পরবর্তী কর্তব্য যখন ঠিক হয়েই গেলো, তখন আজকের মতো এখানেই গল্প শেষ করা সমীচীন মনে হয়।

 

হাঙ্গেরীয় সাধুভাষায় বিদায়-সম্ভাষণ সূচক শব্দটি হলো viszontlátásra ।

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top