Tinpahar
No Comments 11 Views

৺পচিশে বৈশাখ

সাল ১৯৭৫। এপ্রিল প্রায় শেষ। আর কদিন পর-ই ৺পচিশে বৈশাখ। বিকেলবেলা দুধ-টুধ খেয়ে কলকাতার শান্ত-নির্জন লেক গার্ডেন্স পাড়া দিয়ে একটা ৯ বছরের লক্ষী মেয়ে পেছনের রাস্তার লিলি-জেঠির বাড়ি যাচ্ছে রিহার্সাল দিতে। সেবার হবে অভিসার। মেয়েটা লেক মার্কেট পাড়ার রবিতীর্থ-এ নাচ শিখতে যায় খবর পাওয়ায় পাড়ার জেঠিরা তাকে পাকড়াও করেছে।

এর আগে কখনো সে ৺পচিশে বৈশাখের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সু্যোগ পায় নি। তাদের কনভেন্ট স্কুল। সেখানে ৺পচিশে বৈশাখে ছুটি থাকে। রবীন্দ্রনাথকে মেয়েটা চেনে কি না ঠিক বলা যাচ্ছে না। বাংলা ক্লাসে সহজ পাঠ পড়তে হয় আর শিশু ভোলানাথ-ও। তার অবশ্য সবচেয়ে ভালো লাগে ওই কবিতাটা—‘দিনের আলো নিভে এল সুয্যি ডোবে ডোবে/ আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে ৺চাদের লোভে লোভে। স্কুলে ফুল্লরা মিস্  যাকে তাদের সাদা আলখাল্লা-পড়া সিস্টাররা ফ্লোরা বলে ডাকেন  তিনি পিয়ানো বাজিয়ে শেখান ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে। 

 

গান শুনতে ভালো লাগে মেয়েটার। তাদের বাড়িতে যে কেউ গান গায়, তা নয়। তবে রেডিওতে গান শোনা হয় আর রবীন্দ্র সদনে নিয়মিত যাওয়া হয় গান শুনতে। বাড়িতে একটা রেডিওগ্রাম আছে। ড্যালহাউসির বিখ্যাত দোকান রেডিও সাপ্লাই স্টোর্স-এর। সেই যারা ডোওয়ারকিনের হারমোনিয়ামের জন্য বিখ্যাত, তাদের দোকানের। বিয়ের সময় মা-কে দিয়েছিলেন তার দাদু। আর একটা সাবেকি রেকর্ড ক্যাবিনেট-ও আছে। মেয়েটা যেহেতু একা, মানে কোনো ভাই-বোনের সঙ্গে এক বাড়িতে বেড়ে ওঠে নি, তাই শৈশবে ওই ক্যাবিনেটের রেকর্ডগুলোই হয়ে ওঠে তার প্রধান সঙ্গী। আব্বাসুদ্দিন, নির্মলেন্দু চৌধুরী, আঙুরবালা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রজার হূইটিকার, হ্যারি বেলাফন্টে। সেখান থেকেই একদিন সে বেছে নেয় কালো রেকর্ডের মাঝখানে হলদে-গোলাপী চাক্তির মধ্যে এক পিঠে লেখা মেঘ বলেছে যাব যাব আর অন্য পিঠে গোধূলি লগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা। গমগম করে ওঠে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠস্বর। তারপর একে একে সুচিত্রা মিত্র, সন্তোষ সেনগুপ্ত, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, ঋতু গুহ, বন্দনা ঘোষ। খুলে যায় একটা অন্য ভুবন। সেই ভুবনে ৺যারা গাইছেন ৺তারাই হয়ে ওঠেন মুখ্য, রবীন্দ্রনাথ গৌণ।

 

তারপর বাবা-মা-র সঙ্গে যেদিন গিয়ে ভর্তি হয় রবিতীর্থ-এ, সেদিন একেবারে কাছ থেকে দেখে সুচিত্রা মিত্র-কে। ৺এর কাছেই গান শিখেছিলেন মেয়েটার নপিসি। সে শুনেছে নপিসির শান্ত সৌন্দর্য আর ভালো গানের গলার জন্য বেশ ভালো ভালোমানে highly qualified—পাত্রদের সঙ্গে সম্বন্ধ এসেছিল। ৺তাদের মধ্যে ৺যার সঙ্গে ৺তার বিয়ে দেওয়া হয়, তিনি বোধহয় কোনোদিন স্ত্রীর গান শুনতে চান নি। যাক সে কথা। মেয়েটা এতদিন যে মহিলার গলায় নৃত্যের তালে তালে শুনে কতবার কত নটরাজ কল্পনা করতে করতে আপন মনে ঘরময় নেচে বেড়িয়েছে, সেই সুচিত্রা মিত্র-কে এরপর সে নিয়মিত দেখতে পেতে থাকে। আর স্কুলের কাণ্ডারী দ্বিজেন চৌধুরিকে। সুচিত্রা-দ্বিজেন যে পরস্পরের প্রাণের দোসর, সেটা কিছুদিনের মধ্যেই আবছা আবছা বুঝতে পারে মেয়েটা। নাচের ক্লাসের পর সে অনেকদিন চুপ করে বসে থাকে গানের ক্লাসের এক কোণে।

 

রবিতীর্থ-এর বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে নাচতে হয় বাদল বাউলশীতের হাওয়ায় এসব গানের সঙ্গে। তবে তার সবথেকে ভালো লাগে অনুষ্ঠানের শেষে সবাই মিলে যে গানটা গাওয়া হয়—‘আমরা সবাই রাজা। তার বাবার কাছ থেকে সে অবশ্য একটা অদ্ভুত কথা শুনেছে গানটা সম্বন্ধে। এই গানটা কম্যুনিস্টরা গায়। কম্যুনিস্ট কী? তারা কারা? দেবব্রত বিশ্বাস কম্যুনিস্ট, সুচিত্রা মিত্র-ও। বড় হলে বুঝবে। মেয়েটা এর মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না। অনুষ্ঠানের দু-একদিন পর রবিতীর্থ-এ একদিন সবাইকে জলযোগ করানো হয়। খাবারের চাইতে গেলাসে করে যে orange squash টা আসে, সেটাই বেশি ভালো লাগে মেয়েটার।

 

এসবের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তেমন পরিচয় না ঘটলেও শান্তিনিকেতন বলে একটা জায়গা চেনে সে। ছোট্টবেলা থেকে অনেকবার গেছে ট্রেনে করে। ট্রেনের নুন-গোলমরিচ মাখানো শশা খেতে খেতে। সেখানে গেলে রাস্তা দিয়ে ৺হাটতে ৺হাটতে মহুয়া ফুলের যে গন্ধটা পাওয়া যায়, সেটা তার খুব প্রিয়। আর প্রিয় যখন-তখন তাদের বাড়ির কাছে রেল-লাইনের ধারে একা একা চলে যাওয়া। তার মা-এর দাদু-দিদিমা যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন, সেই বাড়িটা যে রাশিয়ান-দিদার, তাকেও খুব ভালো লাগে মেয়েটার। রাশিয়ান-দিদাও মেয়েটাকে প্রজাপতি বলে ডাকেন, আদর করেন। ওখানে দোলের সময় আকাশের নীচে যে অনুষ্ঠান হয়, সেখানে একজন বুড়োমতো লোক গান করেন, ঘুরে ঘুরে নাচেনও। শান্তিদেব ঘোষ। ৺তার গলায় চলে যায়, মরি হায়, বসন্তের দিন, শুনলে মেয়েটার কেন জানি না অসম্ভব কান্না পায়!

 

তাদের পাড়ায় এবারে ৺পচিশে বৈশাখের জন্য তাকে অবশ্য দুটো অন্য গানের সঙ্গে নাচতে হবে। একটা বসন্তের আর অন্যটা নাকি প্রেমের। মেয়েটা বাসবদত্তা, তারই সমবয়সী আর একজন সন্ন্যাসী উপগুপ্ত। যে সন্ন্যাসী সেজেছিল সেই মেয়েটা ভালো গান-ও গাইত। বড় হয়ে, বিয়ে হয়ে, ওই মেয়েটা চলে গেছিল উত্তর ভারতের এক ছিমছাম শহরে। সেখানে প্রবাসী বাঙালিদের গানটান শিখিয়ে সে বেশ নাম-ও করেছিল। কিন্তু মনটা ভারী হয়ে থাকত তার। তার প্রথম সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল নাযাকে বলা হয় প্রতিবন্ধী, তা-ই। আবার একটি বাচ্চার মা হলো সে। এবারে খুব খুশী। ভগবান, রবীন্দ্রনাথ সবাই মুখ তুলে চেয়েছেন। কিন্তু সুখ সইল না। এ বাচ্চাটাও আর ৺পাচটা বাচ্চার মতো নয় জেনে তার মা বেছে নিল মৃত্যু। আরো আরো প্রভু আরো, এমনি করে আমায় মারো গানটা জানত না কি ও? গানটা কি তখন অবান্তর মনে হতো ওই অন্য মেয়েটার? সেসব অবশ্য অনেক পরেকার কথা।

 

এবারের পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তীর জন্য যে দুটো গানের সঙ্গে তাকে বাসবদত্তা সেজে নাচতে হবে, তার মধ্যে একটা গান একটু কেমন যেন—‘রোদন-ভরা এ বসন্ত সখী কখনো আসে নি বুঝি আগে/ মোর বিরহবেদনা রাঙালো কিংশুক রক্তিমরাগে। গানটা আগে সে শুনেছে রবীন্দ্র সদনে, চিত্রাঙ্গদা-য়। চিত্রাঙ্গদার long-playing রেকর্ডটা চালিয়ে বার বার শোনে সে। সারাদিন রজনী অনিমিখা, কার পথ চেয়ে চেয়ে লাইনগুলো তার মাথার মধ্যে কেবল পাক খেতে থাকে। কী সব অদ্ভুত শব্দ থাকে ওই লোকটার একটা একটা গানেঅনিমিখা, পরাণসখা, দুখজাগানিয়া। এসবের মানে কী? শব্দগুলো পাক খেতে খেতে এক সময় কি লোকটাকে একটু চেনা চেনা লাগে?

 

দিন ধরে রোজ বিকেলে বেড়োয় সে রিহার্সাল দিতে। যে সময় বাড়ির বউরা গা-ধোওয়ার প্রস্তুতি নেয় বরদের জন্য। কিন্তু আজ আকাশটা থমথমে। কয়েক পা এগোতে না এগোতেই প্রচণ্ড ধুলো উড়তে শুরু করলো। দমাদম পড়ছে জানলা-দরজা। ঝড়ো হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে না কি বিশ্ব-চরাচর? মেয়েটা পাড়ার একটা ওষুধের দোকানের মধ্যে ৺দাড়াল। খানিকক্ষণ বাদে বৃষ্টি শুরু। তারো খানিক পর বৃষ্টি ধরে এলে, পা চালিয়ে সে ৺পৌছে গেল লিলিজেঠির বাড়ি। তাকে দেখামাত্র বাকিরা সমস্বরে—‘এসে গেছে, আমাদের নটী এসে গেছে! কাতর স্বরে সে বলল, দেরী হয়ে গেল, ঝড় উঠলো যে! লিলিজেঠির হই হই–নটী তো ঝড়ের মধ্যে দিয়েই আসে। জানিস না? তার মানে? তাকে বোকা বোকা মুখ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বড়রা মুখ টিপে হাসেন। আর মেয়েটা নটী হওয়ার তোড়জোড়ে তারপরের কয়েকটা দিনেই অনেকটা বড় হয়ে যায়।
Read More athttp://tinpahar.com/article/233

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top