Tinpahar
No Comments 15 Views

K. G. Subramanyan as a Muralist #2

উনিশশো কুড়ির দশকের প্রারম্ভে উত্তর কেরালার তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে সুব্রহ্মণ্যনের জন্ম।বাল্যকাল থেকেই বৈচিত্রময় পরম্পরাগত শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ট পরিচয় ছিল। গৃহস্থ বাড়ির দেউড়িথেকে রাস্তা পর্যন্ত আঁকা কেরালার প্রচলিত প্রাত্যহিক আলপনা যেমন চিত্তাকর্ষক ছিল তেমনিবিভিন্ন মাঙ্গলিক এবং সামাজিক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে নানা ঋতুতে, উৎসবে রঙিন কাঠের মূর্তি ওভিত্তিচিত্র সুসজ্জিত মন্দির প্রাঙ্গণে আঁকা ঘন জটিল নক্সাদার আলপনা নাচ, গান ও বাদ্যের আবহেসংমিশ্র পরম্পরাগত শিল্পের অনন্যতাকে প্রকাশ করত। পরবর্তীকালে ফরাসী কলোনি মাহেতেবাসা বদলের ফলে সুব্রহ্মণ্যন খ্রীষ্টীয় এবং ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক উপাদানের সঙ্গে পরিচিত হন।মাহেতে আসার পরেই তিনি গান্ধীর স্বদেশী ভাবনা ও চড়কা-সংহতির আদর্শের প্রতি আকর্ষণঅনুভব করেন। কয়েক বছর পরে কুমারস্বামীর লেখা বই পরার সময় পরম্পরাগত শিল্পের ভাষাও যোগাযোগের স্তরভাগ, প্রকাশভঙ্গী ও নান্দনিক বিভিন্নতা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা হয়।

কিছুদিন স্বদেশী রাজনীতি করার পর সুব্রহ্মণ্যন শান্তিনিকেতনে এসে শিল্পপাঠ নেবার সিধান্ত নেন যেখানে নন্দলাল বসুর তত্ত্বাবধানে একইরকম ভাষাগত এবং নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে পরম্পরাধর্মী শিল্পকলার ক্ষমতাকে আধুনিক সময়ের উপযোগী করে বুঝে নেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। আধুনিক সমাজে সুব্যবস্থিত সাংস্কৃতিক সংহতি আনার দায় সমাজের উপর ছেড়ে না দিয়ে নন্দলাল তাকে শিল্পীদের কর্তব্য বলে মনে করেতেন। তিনি মনে করতেন আধুনিক শিল্পীকে শিল্পের বিভিন্ন ধারায় সুদোক্ষ হতে হবে, সেক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি নজর থাকবে ভাব আদানপ্রদানের দিকেও, এবং শিল্পভাষা যেন ততটাই নমনীয় হয় যাতে সংলাপ বিচিত্র স্তরে সঞ্চালিত হতে পারে। এই লক্ষ্যে নন্দলাল বিচিত্র কর্মকান্ডকে শিল্পোশিক্ষার আওতায় এনেছিলেন, মন্ডনশিল্প থেকে পোশাক ও রঙ্গমঞ্চ নির্মাণ, শিশু-গ্রন্থ সচিত্রকরণ, বস্ত্রবয়ন থেকে মুক্তাঙ্গন ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ইত্যাদি সবধরনের কাজেই উৎসাহ দেওয়া হত। নন্দলালের বিশ্বাস ছিল এই শিক্ষাদর্শ একদিকে ছাত্রদের একাধিক শিল্পমাধ্যমে সুদক্ষ করে তুলবে অন্যদিকে জনপরিসরে শিল্পচর্চার ফলে জনরুচির সহন ও গ্রহন ক্ষমতা প্রসারিত হবে।ছাত্রাবস্থ্য় নন্দলালের এই শিক্ষাদর্শে সুব্রহ্মণ্যন সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি। তিনি অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বিনোদবিহারী এবং রামকিংকরের শিল্পচিন্তা থেকে, যারা নন্দলালের চিন্তাকে আধুনিক ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। তাদের কাছে আত্মপ্রকাশই শিল্পচর্চার প্রধান লক্ষ্য। অবশ্য এই মেধাবী সংসর্গ নন্দলালের চিন্তার স্বচ্ছতা বোঝার ক্ষেত্রে ও তার অন্তর্নিহিত আদর্শকে গ্রহণ করার পথে কখনো বাধা হয়েনি। বরং এই দূরত্বই নন্দলালকে বিশদভাবে বোঝবার প্রয়োজনীয় পরিপ্রেক্ষিত পেতে সাহায্য করেছিল, যার ফলে সুব্রহ্মণ্যন যে ব্যপ্তিতে নন্দলালকে জেনেছেন এমন নন্দলালের অনেক ঘনিষ্ট শিষ্যের পক্ষেও সম্ভব হয়েনি।

কর্মজীবনের শুরুতে একান্ত চিত্রচর্চার পাশাপাশি উপার্জনের জন্য মন্ডনধর্মী কারুকাজ করতে গিয়ে তিনি নন্দলালের চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা নতুনভাবে বুঝেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন শিল্পচর্চায় চারু এবং কারুশিল্প পরস্পর অচ্ছেদ্য সম্পর্কে বাঁধা, একই শিল্পবর্ণালীর অংশ।একসময় যা একান্ত প্রয়োজন মাত্র ছিল পরবর্তী কালে সবটাই হলো আত্ম-সমৃদ্ধির পাথেয়; তিনি মন্ডনশিল্পকে তার ব্যবহারিক ও আদানপ্রদানের প্রয়োজনকে অতিরিক্ত হিসাবে না দেখে বরং সুক্ষশিল্পের পরিপূরক হিসাবে দেখতে পেলেন। ব্যবহারিক ভিন্নতা স্বত্ত্বেও এই দুই ধরনের শিল্পগ্জ্ঞান শিল্পীকে নিজস্ব শিল্পভাষা তৈরী করতে এবং ভাষার সঙ্গতি বুঝে নিতে সাহায্য করে। পরম্পরাগত শিল্পের ক্ষেত্রে ভাষার সম্বৃদ্ধি আসে সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ থেকে যা মূলত শিল্পী ও শিল্প-পাঠকের পারস্পরিক সংলাপের ভিত্তি। কিন্তু সুব্রহ্মণ্যন বুঝতে পারেন আধুনিকযুগে শিল্পীর নিজস্ব ভাষা-সংগতি আসে অন্য শিল্পভাষার রূপ ও রীতিপদ্ধতি থেকে, যা দর্শক লক্ষ করেন শিল্পীর কাজে ব্যবহৃত সংমিশ্র ভাষা-উপাদানের মাধ্যমে। শিল্পীর কাজের ব্যাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষাগুণ ও সংলাপ সক্ষমতাও ক্রমে বাড়তে থাকে তাই ষাট-র দশকে সুব্রহ্মণ্যনের কাজে দেখতে পাই ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র ও প্রাচুর্য যা বস্তুত তার সত্ত্বার বহুমুখী প্রকাশবাসনারই প্রকাশ। তার সৃষ্টির ভান্ডার আজও বছর বছর বিচিত্র শিল্পকর্মে ক্রমশ ধনী হয়ে উঠেছে।ছেলেদের বই-ছবি ও হরেক জিনিসে গড়া পুতুল ছাড়াও তিনি শান্তিনিকেতন কিংবা বরোদার মেলায় রঙিন সরার কাজ, নাটকের জন্য করা অভিনব পোশাকের নকশাও করেছেন। তার পাশাপাশি আছে জলরং, তেলরং গুয়াশে আঁকা অজস্র ছবি, প্রতীপচিত্র, পোড়ামাটির উদ্গত ফলক, বনা কিংবা মডেলিং ভাস্কর্য, অজস্র রেখাচিত্র, কাটাকুটি-রেখার ছবি, সরাসরি রং দিয়ে দেওয়ালে আঁকা ম্যুরাল, কাপড়ের উপর রং, ছাপায় ও বস্ত্ররঙ্গক দিয়ে করা ম্যুরাল, কাঁচের উল্টোপিঠে রং করে অথবা সিমেন্ট, পোড়ামাটি সেরামিক্সে তৈরী নানা মাধ্যমে ও আঙ্গিকে গড়া ম্যুরাল। এই বিপুল সৃষ্টি-বৈচিত্র সমকালীন অন্য শিল্পীদের মধ্যে দুর্লভ।

বৈচিত্রের পাশাপাশি সুব্রহ্মণ্যনের শিল্পসাধনা আধুনিক শিল্পকে প্রদর্শনীশালার চৌহদ্দির বাইরে বৃহত্তর পাঠক সমাজের পরিসরে পৌঁছে দেবার একটি শিল্পিত উপায়ও বটে। যদিও শিল্পমেলায় সাধারণের জন্য করা সুলভ শিল্পবস্তুগুলি গ্যালারীওয়ালা ও সংগ্রাহকের হাতে-পকেটে মহার্গ্য হয়ে গেছে, তথাপি তার করা সচিত্র বই ও ম্যুরালকে তাদের নিজস্ব চরিত্র গুনের জন্য সংগ্রাহক-মনোবৃত্তি ও বাজারী মানসিকতার প্রতিকী প্রতিরোধ হিসাবে দেখা যেতে পারে। বই কিংবা ম্যুরাল উপভোগ করা যেমন সাধারণ দর্শকের সাধ্যের মধ্যে তেমনি উপভোগের সময় দর্শক শিল্পীর পরিচয় ও পদমর্যাদা চিন্তা করে বিব্রত বা সংকুচিত হননা। জনপরিসরে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে সুব্রহ্মন্যনের প্রাথমিক লক্ষ ছিল শিল্পের নান্দনিক বার্তা কিভাবে সহজে, রুচিবিভক্ত সমাজের একাধিক স্তরে সঞ্চারিত করা সম্ভব। সৌখিন দুর্মূল্য পণ্য মাত্র নয়, শিল্প তার কাছে আদানপ্রদান ও রসালাপের জরুরী মাধ্যম। বইয়ের ছবি কিংবা ম্যুরাল প্রথমত অলংকরণ যা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ক্রমে আগ্রহী দর্শক শিল্পবস্তুর রং, রূপ-ভাবনার সাথে পরিচিত হন, হয়েত তার সঙ্গে সংলগ্ন বস্তু ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সম্পর্কেও পাঠক সচেতন হয়ে ওঠেন। একজন উপনিবেশ উত্তর কালের শিল্পী হিসাবে সুব্রহ্মণ্যন-র শিল্পভাশায় প্রাচ্য-প্রতীচ্যের নানাবিধ শিল্প ঘরানার অনুরণন অনুভূত হয়, তার আঙ্গিক-পদ্ধতি বিচিত্র ও প্রথাবিরূদ্ধ। তথাপি তিনিই উত্তর চল্লিশ দশকের সবচয়ে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় শিল্পী যার কাজ ও ভাবনায় নন্দলালের আদর্শ যথার্থ অনুসৃত হয়েছে।

About the author:
Has 212 Articles

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to Top